মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের সাহায্য করুন আবু আহমেদ

%e0%a6%86%e0%a6%ac%e0%a7%81-%e0%a6%86%e0%a6%b9%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%a6আজ কয়টা দিন বিবেকের দংশনে দংশিত হচ্ছি। রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীকে সমূলে বিনাশ করার একটা ক্রাশ প্রোগ্রাম যেন মিয়ানমার সরকার হাতে নিয়েছে।

রোহিঙ্গারা হলো আগের আকিয়াবের অধিবাসী। সেই আকিয়াবের আজকের নাম হলো রাখাইন। নামটি মিয়ানমার সরকারের দেওয়া। একসময় আকিয়াবে মুসলিম খেলাফত ছিল, আমরা আমাদের বাপ-দাদাদের মুখে বর্মা মুল্লুকের অনেক গল্প শুনেছি।

আমাদের দেশের অনেক লোক জাহাজে করে বর্মার রেঙ্গুন এবং মর্মাই শহরে গিয়েছিল। হিন্দি সিনেমায় বর্মা ও রেঙ্গুন নিয়ে বিষাদের-বিরহের গান আছে। স্ত্রী দেরাদুন, স্বামী রেঙ্গুন, স্বামীর প্রাণ পড়ে আছে স্ত্রীর কাছে সেই দেরাদুনে। আমাদের দেশের অনেক লোক, বিশেষ করে নোয়াখালী-চট্টগ্রাম অঞ্চলের লোকজন আগের বর্মা মুল্লুকে গিয়ে কাজ করেছে। কেউ কেউ বার্মিজ মহিলাকে বিয়ে করে থেকেও গেছে। তখন পানির জাহাজ নিয়মিত চট্টগ্রাম ও রেঙ্গুনের মধ্যে চলাচল করত। পাসপোর্ট লাগত বর্মা যাওয়ার জন্য এবং সেই পাসপোর্ট অতি মূল্যবান ছিল। অল্প সময়ের জন্য বার্মা-ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অংশ হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানিরা যখন বার্মা দখল করে নেয়, তখন বার্মিজরা জাপানিদের পক্ষ নেয় এবং অস্থায়ী ভারতীয়দের দেশ ত্যাগে বাধ্য করে। অনেক ভারতীয় সেই সময় পাহাড়-পর্বত অতিক্রম করে হেঁটে নিজের দেশে চলে আসে। পথে অনেক লোকের মৃত্যুও হয়। আকিয়াব বা আজকের রাখাইন বরাবরই মুসলিম অধ্যুষিত ছিল। এমন নয় যে তারা শুধু ইংরেজ শাসনামলে বা তারও পরে এই দেশ থেকে ওইখানে গিয়ে বসতি স্থাপন করেছে। সত্য হলো, ওই সব রাখাইনবাসী অনেক পুরনো দিনের। যেভাবে এ দেশে ইসলাম এসেছে, ঠিক সেভাবে আকিয়াব বা রাখাইনেও ইসলাম পৌঁছেছে। আকিয়াবের যোগাযোগ ছিল বহির্বিশ্বের সঙ্গে সেই অনেক পুরনো কাল থেকে। আকিয়াবের সঙ্গে চট্টগ্রামের একটা মিল আছে এ জন্যই যে এই অঞ্চলটা ও চট্টগ্রাম পাশাপাশি, মাঝখানে একটা নদী—সেই নাফ নদ, যে নদের মধ্যভাগ আজকে বাংলাদেশ-বার্মার সীমানা হিসেবে কাজ করছে। বার্মা আমাদের অতি কাছের দেশ, পূর্ব থেকে পরিচিতও বটে। কিন্তু সত্য হলো সেই বার্মার সঙ্গে তাদের স্বাধীনতার পর সম্পর্কটা যেন অনেক পিছিয়ে গেছে।

স্বাধীন বাংলাদেশ তাদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের তথা উষ্ণায়নের অনেক চেষ্টা করেছে কিন্তু বার্মার অবস্থানটা এ ক্ষেত্রে বরাবরই শীতল ছিল। এক অজানা ভয় যেন তাদের মধ্যে কাজ করছে যে বাংলাদেশের সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক স্থাপন হলে পাছে তাদের ক্ষতি হয়ে যায়। আজকে বাংলাদেশ-বার্মার মধ্যে যে সম্পর্ক সেটা হলো কাজ চালিয়ে যাওয়ার সম্পর্ক। বার্মা বহুদিন ধরে একটা ক্লোজ বা বদ্ধ দেশ ছিল। বাইরের জগতের সঙ্গে সম্পর্কটাকে তারা যেন ভয় পেত। তবে চীনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ভালো ছিল। তারও কারণ ছিল দুটি—এক. চীনকে তারা সাম্রাজ্যবাদী ভাবত না। দুই. চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ থাকলে অন্তত আর্থিক অবরোধ তাদের অর্থনীতিকে কাবু করতে পারবে না। আজকে বার্মা তার জানালাগুলো খুলে দিয়েছে। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের জানালাটা যেন আগের স্থানেই আছে। সেই জানালায় আগে যেমন কিছু ফাঁক ছিল, আজও তাই আছে।

এরই মধ্যে বাংলাদেশ কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে বার্মার গুন্দুম (Gundum) পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে। এ ক্ষেত্রেও বার্মার পিছুটান আছে। পাছে বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি রোড কানেকশন হয়ে গেলে তাদের যদি কোনো ক্ষতি হয়ে যায়। প্রায় তিন যুগ ধরে তারা আকিয়াব তথা তাদের রাখাইন প্রদেশের মুসলিম নাগরিকদের ওপর অত্যাচার-নিপীড়ন চালিয়ে আসছে। অনেক রাখাইন মুসলিম কক্সবাজারের আশ্রয়শিবিরগুলোতে আজও আশ্রিত আছে। এসব রোহিঙ্গা মুসলমানকে বার্মা বলছে তারা ভিন দেশের নাগরিক, ভিন দেশ হলো বাংলাদেশ। কিন্তু বার্মার এই বক্তব্যের স্বপক্ষে তাদের হাতে কোনো প্রমাণ নেই। যে মানুষ বহু বছর ধরে রাখাইনে আছে, সেখানে জন্মগ্রহণ করেছে, যাদের বাপ-দাদারাও সেই অঞ্চলের অধিবাসী ছিল, যে অঞ্চলে একসময় ছোট্ট মুসলিম আমিরাত ছিল, সে দেশের লোকদের এখন বার্মা বলছে তারা বাঙালি, বাংলাদেশের লোক।

বার্মার বর্তমান ও পূর্ববর্তী সরকারগুলোর অবস্থান রাখাইনদের ক্ষেত্রে একই রকম। রাখাইনের রোহিঙ্গাদের সেই দেশ থেকে যেতে হবে। রাখাইনের বার্মিজ নেতারা প্রকাশ্যেই বলছেন তাদের এই দেশ থেকে পরিষ্কার করতে হবে। বিশ্ববিবেক এই অত্যাচার-নিপীড়ন দেখে ক্ষণে ক্ষণে বিচলিত হয়েছে বটে। তবে সংঘবদ্ধভাবে রাখাইনের মুসলমানদের রক্ষা করার জন্য তেমন কিছুই করতে পারেনি। অনেকে চেয়েছিল নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ী বর্তমানের মিয়ানমার সরকারপ্রধান অং সান সু চির দিকে। ভেবেছিল তিনি ক্ষমতায় গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্তু সেই চিন্তা ছিল তাদের ভুল, নির্বাচন প্রাক্কালে সু চি বলেছিলেন, রোহিঙ্গাদের সেই দেশে থাকার কোনো অধিকার নেই। তাদের যেতে হবে। বরং সু চির সময়ে এই নিরীহ জনগোষ্ঠীর ওপর অত্যাচার-নিপীড়ন বেড়ে গেছে। সু চিকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, সবই মিথ্যা, সবই অতিরঞ্জিত। তাহলে সত্য কোনটি। কেন জাতিসংঘের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেলকে রাখাইন রাজ্যের দাঙ্গাপীড়িত অঞ্চলগুলোতে যেতে দেওয়া হলো না, যাকে নিয়োগ দিয়েছিল জাতিসংঘে রোহিঙ্গাদের জাতিগত নিধনের বিষয়টি দেখার জন্য। কেন রাখাইনে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের প্রবেশ নিষেধ। যেসব রোহিঙ্গা আগে ভোটার ছিল তাদের সেই ভোটার তালিকা থেকেও বাদ দেওয়া হয়েছে। মিয়ানমারকে মুসলিমশূন্য করার একটা এজেন্ডা বার্মার সরকারগুলো গ্রহণ করে নিয়েছে। আমি জানি না তাদের লাভ কী। কিসের ভয়ে তারা এসব মানবাধিকার লঙ্ঘনের কাজগুলো করে চলেছে। ু

আজকে তারা মিয়ানমারকে মুসলিমশূন্য করতে চাচ্ছে, কালকে যদি বিশ্বের অন্য দেশগুলো ভিন্ন ধর্মের লোকগুলো তাড়ানোর ব্যবস্থা করে, তাহলে কেমন হবে। আমরা কি এমন একটা বিশ্ব কল্পনা করতে পারি, যেখানে এক দেশে শুধু এক ধর্মের মানুষই বসবাস করবে। বিশ্ববিবেক যদি বার্মা সরকারের এই বর্বরতাকে রুখে না দাঁড়ায়, তাহলে রোহিঙ্গাদের ওপর এই নির্যাতন-নিপীড়ন অন্য খারাপ লোকদের বলে দেবে যে ইতিহাসের হীনতম কাজ করেও পার পাওয়া যায়। বাংলাদেশ সরকার বলে আসছে যে বাংলাদেশের সীমান্ত তাদের জন্য বন্ধ। আমরা বিনয়ের সঙ্গে এ অবস্থানের বিরোধিতা করতে চাই। মানবতা বলে একটা বিষয় যদি থেকে থাকে, তাহলে বাংলাদেশকে রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে ভিন্ন অবস্থান নিতে হবে। বাংলাদেশকেই উদ্যোগ নিতে হবে এ বিষয়টি জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোয় তুলে ধরার জন্য। তা করলে বাংলাদেশের সম্মান বাড়বে। একদিকে পালিয়ে আসা লোকদের আগুনের দিকে ঠেলে দেওয়া মানবিক তো নয়ই, অন্যদিকে মনে হবে বাংলাদেশ তার কাজগুলো ঠিকমতো করছে না।

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Add Comment

Click here to post a comment