মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

নাসিক নির্বাচন ইসির জন্য শেষ অগ্নিপরীক্ষা-মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

%e0%a6%ae%e0%a6%ae%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a6%89%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%80%e0%a6%a8-%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%9f%e0%a7%8b%e0%a7%9f%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%80আগামী ২২ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক)  নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ সেলিনা হায়াত আইভীকে, বিএনপি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে মেয়র পদে মনোনয়ন দিয়েছে।

৫ ডিসেম্বর প্রতীক বরাদ্দ পাওয়ার পর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সামগ্রিক নির্বাচনী প্রচার শুরু হয়েছে। দেশের সব মহলই গভীর অপেক্ষায় আছে ২২ তারিখ নির্বাচন শেষে ফলাফল দেখার। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদে এটিই শেষ যেকোনো ধরনের নির্বাচন। সম্ভবত কমিশনও তাদের ওপর চাপটি যে কারণে গভীরভাবে অনুভব করছে। একইভাবে চাপ অনুভব করছে বড় দুই দলের প্রার্থীদ্বয়, দল দুটিও। বলতে গেলে চাপে নেই কে? সবাই কমবেশি একধরনের চাপ বোধ করছেন নিজ নিজ অবস্থান থেকে। এর অবশ্য যথেষ্ট বাস্তবতা রয়েছে। প্রার্থী মনোনয়নে দুই দলই কিছু জটিল অঙ্ক কষে যে হিসাব পেয়েছে, তা থেকে তাদের প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। বিশেষত নারায়ণগঞ্জের মতো জায়গায় যখন এত বড় স্থানীয় সরকার নির্বাচন হতে যাচ্ছে তখন প্রার্থী মনোনয়ন কারো জন্যই সহজ ছিল না। সেলিনা হায়াত আইভী দু-দুবার নির্বাচিত মেয়র ছিলেন। গেলবার তাঁকে নির্বাচন করতে হয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে। তিনি বিপুল ভোটে জয়লাভও করেছিলেন। এর পেছনে অনেক কারণ ছিল। গেলবারের বাস্তবতা এবার হয়তো পুরোপুরি নেই। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব শেষ মুহূর্তে তাদের প্রার্থীকে প্রত্যাহার করার ঘোষণায় অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়েছেন। আইভীর ব্যক্তিগত সহজ-সরল আচরণ, তাঁর বাবার ইমেজ, ব্যক্তিগত সততা, দৃঢ়তা ইত্যাদি অনেককে মুগ্ধ করেছে। আইভীর দৃঢ়চেতা ইমেজ এখনো মনে হয় অটুট রয়েছে। সম্ভবত এসব বিবেচনায় নিয়ে এবার যেহেতু দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হচ্ছে, তাই আইভীকে জেতার জন্য অপেক্ষাকৃত যোগ্য প্রার্থী মনে করেছে। আইভী সন্ত্রাস, দুর্নীতি ইত্যাদির বিরুদ্ধে নির্ভীক ও সাহসী একজন বলেই এখনো সব মহলে পরিচিত। তিনি আওয়ামী লীগ করেন, একই সঙ্গে সাহস ও সত্য ভাষণে ব্যতিক্রমী একজন। এটি আইভী প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন। মেয়রের দায়িত্ব পালনে তিনি কতটা সফল হয়েছেন, কতটা পারেননি সেটি বিতর্কের ঊর্ধ্বে হয়তো নয়। তবে তিনি নারায়ণগঞ্জে আদর্শের প্রতীক হয়ে লড়াই-সংগ্রাম করছেন—এটি সত্য। সেসবই হয়তো বিবেচনায় নিয়ে দল তাঁকে এবার যোগ্য প্রার্থী বলে বিবেচনা করে মনোনয়ন দিয়েছে। তবে নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগে তাঁর অবস্থান খুব বেশি শক্তিশালী না হলেও সংগঠনের সাধারণ নেতাকর্মী, সমর্থক ও  শুভানুধ্যায়ী মহলে কতটা সুদৃঢ়তা বোঝা যাবে সামনের দিনগুলোতে, ভোটের দিনে। তবে আইভী দলের বাইরেও সচেতন মহলের সমর্থন হয়তো নীরবেই পাবেন। অবশ্য আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নারায়ণগঞ্জের সব নেতাকর্মীকে একই মঞ্চে উঠে কাজ করার কথা বলেছেন। এর ব্যত্যয় ঘটলে দলের অনেক নেতাকর্মীরই সামনে সমূহ বিপদ আছে, এটি বোধ হয় নির্দ্বিধায় বলা চলে। সে ক্ষেত্রে নাসিক নির্বাচন নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের মধ্যেও একধরনের চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই চাপ সত্যি সত্যিই বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে, যদি কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে।

অন্যদিকে বিএনপি গেলবার তাদের প্রার্থীকে মধ্যরাতে সরিয়ে নিয়ে যে নজির স্থাপন করেছে, তাতে বিএনপির ভেতরে নানা ক্ষোভ ও হতাশা পুঞ্জীভূত ছিল। অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন যে তৈমূর সাহেবকে এবার দ্বিতীয়বার ‘কোরবানি’ হয়তো দেওয়া হবে না। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অন্য হিসাব কষেছে। তাদের বিবেচনায় সাত খুনের মামলা নিয়ে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান যেহেতু প্রথম থেকে যুক্ত আছেন, তাই তাঁর একধরনের জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছে। এই বাড়তি জনপ্রিয়তার সঙ্গে আওয়ামীবিরোধী, সাম্প্রদায়িক, জামায়াতসহ অন্যান্য গোষ্ঠীর ভোট যুক্ত হলে তিনি জয়ের ভেলায় ধাক্কা দিতে পারবেন। তবে দলের অভ্যন্তরে তৈমূর সমর্থকসহ নানা গোষ্ঠী এসব কতটা সহজে নেবেন, সেটি বোঝা ও দেখা যাবে ২২ তারিখ। তবে দলীয় প্রতীক ছাড়াও অতীতের মতো এবারও নাসিক নির্বাচনে সাখাওয়াত হোসেন খান আওয়ামীবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠীর একচেটিয়া ভোট পাবেন—এটি নিদ্বির্ধায় বলা চলে। কেননা বাংলাদেশে যে স্তরের যত ছোট বা বড় নির্বাচনই হোক, তাতে পরস্পরবিরোধী আদর্শের মধ্যেই শেষ পর্যন্ত ভোটযুদ্ধ হয়। মনে হয় না, নারায়ণগঞ্জে এর বাইরে গিয়ে কিছু হবে। আমাদের দেশে যতই আমরা গণতন্ত্র-গণতন্ত্র বলে চিৎকার করি না কেন, একটি বিরাটসংখ্যক মানুষের কাছে ভোটের সঙ্গে অন্য কিছু জড়িত, অন্য রকম বিশ্বাসও জড়িত। যেকোনো নির্বাচনে তারা সেই বিশ্বাসের প্রতিফলনই বেশি ঘটায়। সুতরাং নাসিক নির্বাচনে দলীয় ও দলের বাইরের ভোটারদের যোগফল শেষ পর্যন্ত কোন দিকে বেশি হবে সেটি ২২ ডিসেম্বরই আমরা কেবল দেখতে পাব। ভোটের বিষয়গুলো কোনো সরল অঙ্কে বের করা কতটা সম্ভব বলা মুশকিল। ২০১৩ সালে বেশ কটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে অনেকেরই ধারণা যা ছিল, ফলাফলে ঘটেছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। এখানেও কী ঘটবে তা আগে থেকে কোনো জরিপ বা অনুমানে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে না। নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন দল, মত, বিশ্বাস ও চিন্তাধারার ভোটাররা কোন দিকে বেশি ভোট দেবে তা তখনই শুধু নিশ্চিত হওয়া যাবে, আগে নয়। সে কারণে আমরা কম চাপে নেই। ভোটের আগে জোয়ার সৃষ্টি হয় দুভাবে। ওপরের জোয়ার দেখে নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে আগাম যে মতামত বা জরিপের ফল প্রকাশ করা যাবে বাস্তবে সেটি নাও ঘটতে পারে। কেননা ভেতরে নীরবে আরেকটি স্রোতধারা তৈরি হতে পারে, যেটি অনেকেই অনুমান করতে পারেন না। যেমনটি গত মার্কিন নির্বাচনে ঘটে গেল। নির্বাচনের পরই শুধু বোঝা গেল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটাররা বাইরে নয়, ভেতরে ভেতরেই শক্তি সঞ্চয় করেছিল। নারায়ণগঞ্জের ভোটারদেরও এর বাইরে গিয়ে দেখার সুযোগ নেই। প্রচার-প্রচারণায় অনেক কিছুই দেখা বা বোঝা গেলেও সব কিছু তাতেই নির্ধারিত হবে—এমনটি নয়। সে কারণেই নাসিক নির্বাচন শুধুই মেয়র নির্বাচন নয়, শুধুই জাতীয় নির্বাচনের ড্রেস রিহার্সেল হবে না, এর থেকে নির্বাচন সংস্কৃতিতেও নতুন বোধের সংযোজন ঘটতে পারে।

মনে রাখতে হবে, ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর এটি বোধ হয় প্রথম বড় ধরনের একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এতে দুই দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতাই শুধু হবে না, বাংলাদেশের পরস্পরবিরোধী দুই আদর্শের লড়াই হতে পারে। তবে এবারও বিএনপি কি শেষ মুহূর্তে রণেভঙ্গ দেবে, দলীয় প্রার্থীদের প্রত্যাহার করে নেবে, নাকি মাঠে থাকবে, শেষ পরিণতিটা দেখাবে—সেটি বড় প্রশ্ন। কেননা নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে এসে বিএনপি প্রার্থী প্রত্যাহার করার যে ঘোষণা দেয় তা তাদের আত্মবিশ্বাসের অভাব থেকে, চাপ থেকে বাঁচার উপায় মনে করে কিংবা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ বলে প্রচার করার চিন্তা থেকে। বিএনপি সেই সুযোগও খুব বেশি কাজে লাগাতে পারেনি। এবার শেষ পর্যন্ত কী করবে তা-ও ২২ ডিসেম্বরেই দেখা যাবে। আকস্মিকভাবে মাঠ ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা এলেও বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকবে না। নাসিক নির্বাচনে তেমনটি হবে না—এটিই সবাই আশা করে।

লেখক : অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

patwari54@yahoo.com

Advertisements

Add Comment

Click here to post a comment