Advertisements
অপরাধ/দুর্নীতি

দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী কেরানীগঞ্জের আমির!

২০১২ সালের ২৩ নভেম্বরের ভোর। পুলিশ খবর দিল, কেরানীগঞ্জের শিশু পরাগ অপহরণ মামলার প্রধান আসামি মোক্তার হোসেন ওরফে ল্যাংড়া আমির টঙ্গীতে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। কিন্তু পরে জানা গেল, গুলিবিদ্ধ হলেও বেঁচে আছেন আমির। সেই আমিরই গত বছরের ১১ আগস্ট ঢাকার আদালতের হাজতখানা থেকে পুলিশকে বোকা বানিয়ে পালিয়ে যান।


দুর্ধর্ষ এই সন্ত্রাসী এখন কেরানীগঞ্জের ত্রাস। সেখানকার কয়েকজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ইতিমধ্যে তাঁর হাতে গুলিবিদ্ধও হয়েছেন। পুলিশ বলছে, তাঁর গতিবিধি ভৌতিক আর কর্মকাণ্ড পৈশাচিক। পুলিশকে মারারও হুমকি দিয়েছেন তিনি। তাঁর ভয়ে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিজের নিরাপত্তা বাড়িয়েছেন।

এত ভয়ংকর আসামি, তারপরও কেন ধরা পড়ছে না? প্রশ্ন করতেই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শাহ মিজান শাফিউর রহমান বললেন, ‘ভয়ের কিছু নেই। অচিরেই সে ধরা পড়বে। আসলে সে কেরানীগঞ্জ এলাকায় থাকে না। মোটরসাইকেলে চেপে হেলমেট মাথায় দিয়ে কেরানীগঞ্জে এসে ঘটনা ঘটিয়ে চলে যায়। নিজের কোনো মোবাইল ফোনও নেই।’

২০১২ সালের ১১ নভেম্বর সকালে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যার পশ্চিমপাড়ায় বাসার গলির মুখ থেকে মা, বোন ও গাড়িচালককে গুলি করে শিশু পরাগ মণ্ডলকে অপহরণ করে আলোচনায় আসেন আমির। এর আগেই অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়েছিল। পুলিশ বলছে, আমিরের বাড়ি মুন্সিগঞ্জের মিরকাদিম এলাকায়। একসময় দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের পশ্চিমপাড়া এলাকায় জমির ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন, এরপর হাসনাবাদ এলাকায় আবাস গড়েন। ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না বলে তাঁর নামের সঙ্গে ‘ল্যাংড়া’

শব্দটি জুড়ে দিয়েছে এলাকাবাসী। তাঁর চলাচলের একমাত্র বাহন মোটরসাইকেল। সহযোগীরা মোটরসাইকেল চালান আর আমির পেছনে বসে থাকেন।

পুলিশের কর্মকর্তারা বলেন, পুলিশের কাছ থেকে পালানোর পর চলতি বছরের মার্চ থেকে কেরানীগঞ্জ এলাকায় আবারও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করেন আমির। গত ২২ মার্চ চিকিৎসক দম্পতি আবু নোমান ও শাহানা নোমানের রিকশা থামিয়ে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে চিরকুট দেন ল্যাংড়া আমির। চিরকুট দেওয়ার সময় গুলি ছুড়ে আহত করেন তাঁদের বহনকারী রিকশাচালককে। চিকিৎসক আবু নোমান রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে চাকরি করেন, পাশাপাশি কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়ায় একটি ক্লিনিক চালান এই দম্পতি। চলে যাওয়ার সময় বলেন, ২০ লাখ টাকা না দিলে পরের গুলিটা তোদের বুকে করা হবে।

 বিষয়টি পুলিশকে জানানোর পরে আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন আমির। গভীর রাতে ক্লিনিকের নম্বরে খুদে বার্তা আসে, ‘ম্যাডাম অ্যান্ড স্যার, আপনারা জীবনে অনেক বড় ভুল করলেন, ২০ লাখ টাকা না দিয়ে এখন বড় ক্ষতির জন্য রেডি হোন। আর দুই কোটি টাকা রেডি করেন। কালকে লাইফ বোনাস দিছি।’ এরপর আতঙ্কে কেরানীগঞ্জ ছাড়েন ওই দম্পতি।

এরপর গত ২২ মে দিনদুপুরে জিয়ানগর এলাকায় ব্যবসায়ী নুরুল ইসলামের রিকশা থামিয়ে একই কায়দায় তাঁর পায়ে গুলি করেন আমির। যদিও নুরুল সব সময় নিজের নিরাপত্তার জন্য একজন আনসার সদস্য সঙ্গে রাখেন, সেদিন আনসার সদস্য তাঁর পাশে একই রিকশায় বসে ছিলেন।

সর্বশেষ গত রোববার রাতে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকায় ব্যাবসায়ী শাহ আলমের বুকে গুলি করেন আমির। শাহ আলম নিজের ইট-বালুর ব্যবসার গদি থেকে গাড়িতে করে বাসায় ফেরার সময় মোটরসাইকেলে থাকা সন্ত্রাসীরা তাঁকে গুলি করে।

শাহ আলমের ছোট ছেলে শাহীন আলম বলেন, দুই মাস আগে থেকে আমির চিরকুট লিখে তাঁদের বাসায় পাঠিয়ে চাঁদা দাবি করেন। সেই চিরকুটে লেখা ছিল, ‘আপনি তো কয়েক শ কোটি টাকার মালিক। দু-এক কোটি টাকা দিলে আপনার কিছুই হবে না।’ তিনি বলেন, অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে আমিরই কেরানীগঞ্জের রাজা।

 শাহ আলম কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এবং চলচ্চিত্র প্রযোজক নাজিমউদ্দীনের বড় ভাই। তাঁদের পরিবার এলাকায় প্রভাবশালী হিসেবেই পরিচিত। এ রকম পরিবারের লোকও হামলার শিকার হওয়ার পরে ব্যবসায়ীদের আতঙ্ক আরও বেড়ে গেছে।

স্থানীয় একজন প্রতিষ্ঠিত নির্মাণ ব্যবসায়ী বলেন, তাঁরা খুব ভয়ে আছেন। ব্যবসায়ী সমিতিগুলোর সভায়ও আমিরের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ওসিকেও আমির হুমকি দিয়েছেন বলে তাঁরা শুনেছেন। তাঁকে ধরতে গেলে তিনি দু-তিনজন পুলিশকে নিয়েই মরবেন বলে হুমকি দেওয়ার কথা এলাকায় উড়ে বেড়াচ্ছে। আমিরের এমন বেপরোয়া ভাব ব্যবসায়ীদের আতঙ্কে ফেলেছে। দু-একজন এর মধ্যেই চিরকুট পেয়ে গোপনে টাকাও দিয়েছেন বলে অনেকে জানিয়েছেন।

আমিরকে ধরতে কাজ করছেন এ রকম একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, আমির এবার বলে বেড়াচ্ছেন যে একবার গুলিতে যখন তিনি মারা যাননি, এবার তাঁকে ধরতে এলে দু-একজন পুলিশকে নিয়েই তিনি মারা যাবেন। তাই পুলিশ কর্মকর্তারাও আমিরের বিষয়ে সতর্ক হয়েছেন। থানার পুলিশের পাশাপাশি পুলিশের বিশেষায়িত বাহিনীগুলোর কাছেও সাহায্য চেয়েছে ঢাকা জেলার পুলিশ।

জানতে চাইলে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমিরের সঙ্গে আমার শত্রুতাটা এখন ব্যক্তিগত পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে। ২০০০ সালে ওরে প্রথম অস্ত্রসহ ধরলাম, পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলিতে তখনই ওর পা খোঁড়া হয়ে যায়। এরপর ২০১২ সালে টঙ্গী থেকে তাকে আবারও গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ধরা হলো। সেবারও সে (আমির) পুলিশের ওপর চড়াও হয়েছিল। আশা করছি তৃতীয়বার তার সঙ্গে আবার আমারই দেখা হবে।’

২০১২ সালে পরাগ অপহরণের ঘটনার ১২ দিনের মাথায় ২৩ নভেম্বর টঙ্গীতে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধের পর আমির নিহত হয়েছেন বলে মনে করেছিলেন পুলিশ কর্মকর্তারা। তাঁর নিহত হওয়ার খবর সংবাদ মাধ্যমকেও জানানো হয়। কিন্তু হাসপাতালে আনার পর আমির আবারও বেঁচে ওঠেন।

ওই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘মৃত্যু থেকে বাঁচার পরে সে পিশাচ হয়ে উঠেছে। কোনো দয়ামায়া নেই। গ্রেপ্তার হওয়ার পরে আমির বলেছিল, অস্ত্র কেনা তার শখ।’

২০১২ সালের নভেম্বরে পরাগ মণ্ডল অপহরণ ঘটনার পর থেকেই পরাগদের বাড়িতে চার বছর ধরে পাহারা দিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। কিন্তু গত বছর আমির আদালতের হাজত থেকে পালানোর পর পরিবারটি রয়েছে মারাত্মক আতঙ্কে।

পরাগের বাবা ব্যবসায়ী বিমল মণ্ডল বলেন, ‘আমির পালানোর পর থেকে আতঙ্ক বেড়ে গেছে। আমাদের বাসায় পুলিশ থাকলেও নিরাপত্তাহীনতায় আছি। পুলিশ যে পর্যন্ত আমিরকে না ধরবে, সে পর্যন্ত আমাদের শান্তি নাই।’

Advertisements