জাতীয় রাজনীতি

তোমাকে আর আমি বাঁচাতে পারলাম না, এক্ষুণি তুমি অফিস থেকে বেরিয়ে যাও

৩ জুন ২০০৪। বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব এ এইচ এম নূরুল ইসলাম অফিসে গেলেন। অফিসে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই ডাক পেলেন প্রধানমন্ত্রীর। প্রধানমন্ত্রী সাধারণত এত সকালে কার্যালয়ে আসেন না। একটু অবাকই হলেন তিনি। ছুটে গেলেন প্রধানমন্ত্রীর কক্ষে। কক্ষে ঢুকেই যেন বোমা ফেটে উঠল, বেগম জিয়া চিৎকার করে বললেন, ‘তোমার এত বড় সাহস, তুমি তারেকের বিরুদ্ধে তদন্ত করাও। তোমাকে আর আমি বাঁচাতে পারলাম না। এক্ষুণি তুমি অফিস থেকে বেরিয়ে যাও।’
এ এইচ এম নূরুল ইসলাম তো অবাক। তিনি ঘটনা ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। প্রধানমন্ত্রীর রুদ্রমূর্তি। রীতিমতো বের করে দিলেন তাঁর সচিবকে। বেচারা প্রধানমন্ত্রীর কক্ষ থেকে বেরিয়ে সোজা চলে গেলেন বাসায়। সন্ধ্যা ৭টার দিকে তাঁর এক বন্ধু সচিব তাঁকে ফোন করে জানাল, মহামান্য রাষ্ট্রপতি তাঁর বাধ্যতামূলক অবসর সংক্রান্ত ফাইলে স্বাক্ষর করেছেন। এর আধ ঘণ্টার মধ্যে তাঁর বাসভবন ঘিরে ফেলল বিপুল পরিমাণ পুলিশ। অভিযোগ হলো, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গোপন কাগজপত্র তিনি সরিয়ে এনেছেন। নূরুল ইসলাম বোঝালেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কোনো নথি বাড়িতে আনার সুযোগ নেই। এগুলো স্ক্যান করে হার্ডডিস্কে রাখা হয়। তারপরও তাঁরা তল্লাশি চালাল। বেশ কিছুক্ষণ তল্লাশি চালিয়ে কিছু না পেয়ে তাঁরা চলে গেল। তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি তথ্য ফাঁসের মামলাও করা হলো।
এ এইচ এম নূরুল ইসলাম, ১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক ছিলেন। ১৯৯৪ সাল থেকে ৯৬ পর্যন্ত তিনি ফেনীর জেলা প্রশাসক ছিলেন। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে তাঁকে একান্ত সচিব করা হয়। পরে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব গ্রহণের পরই তিনি প্রধানমন্ত্রীর বড় ছেলে তারেকের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ পেতে থাকেন। এর মধ্যে টেলিটকের যন্ত্রপাতি ক্রয় সংক্রান্ত টেন্ডারে একটি পার্টির জন্য তদবির করছিলেন কোকো। টেন্ডারে ওই প্রতিষ্ঠানটি তৃতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা হয়। তাদের মূল্য ছিল টেলিটকের প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়েও বেশি। তখন সরকারি ক্রয় কমিটি প্রাক্কলিত মূল্য বাড়ায়।
দুই বার ক্রয় কমিটি তৃতীয় দরদাতার প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। এসময় বেগম জিয়া খুবই উদ্বিগ্ন হন। তৃতীয়বার ক্রয় সংক্রান্ত কমিটির বৈঠকে যেকোনো মূল্যে কোকোর পছন্দের কোম্পানিকে কাজ দিতে বলেন। তৃতীয় বৈঠকে ১০ সদস্যের কমিটিতে শুধু সাইফুর রহমান এবং ড. খন্দকার মোশারফ হোসেন উপস্থিত থেকে কোকোর প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন দেয়। অন্যরা ভবিষ্যতের মামলার ভয়ে বৈঠকেই উপস্থিত হননি। এই বৈঠকের সার সংক্ষেপ আসে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য। প্রধানমন্ত্রীর সচিব হিসেবে নূরুল ইসলাম একটি নোট দেন। নোটে তিনি ভবিষ্যতে এ নিয়ে মামলার আশঙ্কা করেন। পরে বেগম জিয়া, সচিবকে ডেকে ক্ষুব্ধ কন্ঠে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে কে মামলা করবে?’ তিনি হারিছ চৌধুরীকে নির্দেশ দেন ওই নোট ছিড়ে ফেলতে। এখান থেকেই বিরোধের সূত্রপাত।
৪ এপ্রিল ২০০৪ সালে প্রধামন্ত্রীর কার্যালয়ে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে অন্তত ৫০ টি দুর্নীতির অভিযোগ আসে। এর মধ্যে একটি ছিল চীন সরকারের ঋণের হাজার কোটি টাকা লুটপাট। এ ধরণের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সুনির্দিষ্ট নিয়ম আছে। এজন্য একজন পরিচালক দায়িত্বপ্রাপ্ত। ওই পরিচালক অভিযোগগুলোর ব্যাপারে করণীয় জানতে সচিবের দারস্থ হন। সচিব তাঁকে অভিযোগগুলোর ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের মতামত জানার নির্দেশ দেন। ২০ এপ্রিল ২০০৪ সালে ওই কর্মকর্তা ৪ টি মন্ত্রণালয়ে তারেক জিয়ার দুর্নীতির অভিযোগ সংক্রান্ত চিঠির ব্যাপারে মতামত চেয়ে চিঠি দেন। এটা অভিযোগ নিস্পত্তির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু বেগম জিয়া তাঁর ছেলেদের দুর্নীতির ব্যাপারে এতই উদার ছিলেন যে, তিনি তাঁর বিশ্বস্ত সচিবকেও কোরবানি দেন।
সৌজন্যেঃ পূর্বপশ্চিমবিডি

Advertisements