Advertisements
আন্তর্জাতিক

তেল আবিব : ফুর্তি ও নৈরাশ্যের নগরী

বাংলাদেশীদের ইসরাইল ভ্রমণ নিষিদ্ধ। কিন্তু অবৈধভাবে প্রতিষ্ঠিত বিশ্বের একমাত্র ইহুদি রাষ্ট্রটি আসলে কেমন দেখতে। সেখানকার মানুষ, জীবনযাত্রার হালহকিকতই বা কী? বিদেশী সাময়িকী অবলম্বনে তারই খণ্ডচিত্র এ লেখাটি।

আব্রাহাম একটা কাজ খুঁজছে। যেকোনো কাজ হলেই চলবে। কোনোরকম কাজেই তার আপত্তি নেই। তার দরকার একটা কাজ এবং সেটা আজকেই।

আব্রাহামের বয়স এখন ২৫। তার বয়স যখন ২১, তখনই সে নিজ দেশ ইরিত্রিয়া ছেড়ে ইসরাইলে চলে আসে। আশা ছিল, এখানে নিজ দেশের চেয়ে আরো ভালো একটা জীবন পাবে; অন্তত একটা চাকরি তো পাবেই।

এর মধ্যে চার বছর কেটে গেছে। আব্রাহামকে এখনো প্রতিদিন ভোর ৫টায় চলে আসতে হয় লেভিনস্কি পার্কের সামনের রাস্তায়। এখানে তার মতো আরো শত শত আফ্রিকান শ্রমিক প্রতিদিন ভোরে এসে জড়ো হয়। এসব শ্রমিকের কারোরই ইসরাইলি ওয়ার্ক পারমিট নেই। তাই ওরা অবৈধ শ্রমিক। ওদের সস্তায়, এমনকি নামমাত্র মজুরিতে পাওয়া যায়। তাই অনেকে এসে ওদের কাউকে কাউকে নিয়ে যায়। ভারী কাজ, অথচ মজুরি ঘণ্টায় মাত্র ২৫ শেকেল (ইসরাইলি মুদ্রা, প্রায় ছয় মার্কিন ডলারের সমতুল্য) অর্থাৎ দৈনিক ২০০ শেকেল। অথচ বৈধভাবে এই মজুরি হওয়ার কথা আড়াই হাজার শেকেল।

লেভিনস্কি পার্কটি দক্ষিণ তেল আবিবের নেভে শা’আনান এলাকায় অবস্থিত। এর কাছেই রয়েছে কুখ্যাত সেন্ট্রাল বাস স্টেশন। নেগেভ মরুভূমির হলোট ডিটেনশন সেন্টার থেকে মুক্তি দিয়ে শরণার্থীদের এখানেই ‘’পুনর্বাসিত’’ করা হয়। বেশিরভাগ শরণার্থী এই এলাকা ও সংলগ্ন অন্যান্য এলাকায় বসবাস করে। তারা যেসব অ্যাপার্টমেন্টে থাকে, তাতে লোক গিজগিজ করে আর অ্যাপার্টমেন্টগুলো দেখেশুনে রাখারও তেমন কেউ নেই।

কারা এই শরণার্থী? এদের বেশির ভাগই মিসর-ইসরাইল সীমান্ত ডিঙিয়ে চুরি করে ইসরাইলে ঢুকে পড়েছে। ওরা প্রধানত এসেছে সুদান ও ইরিত্রিয়া থেকে। এদের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার।

ইসরাইল এদের নিয়ে পড়েছে গ্যাঁড়াকলে। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো যাচ্ছে না। অপর দিকে দেশটির কট্টরপন্থীরা এদের ওপর ভয়ানক খাপ্পা। বলে, ওরা হলো ‘অনুপ্রবেশকারী’। ওই ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ বিরুদ্ধে কয়েকবার বিক্ষোভও করেছে কট্টরপন্থীরা। কট্টরদের হাওয়া পেয়ে সরকার এই শরণার্থীদের ওয়ার্ক পারমিট দিতে অস্বীকার করেছে। ইসরাইলের সংস্কৃতিমন্ত্রী মিরি রেগেভ তো বলেই ফেলেছেন, এই শরণার্থীরা হচ্ছে ইসরাইলের জন্য ক্যান্সার।

ওরা আফ্রিকানদের বের করে দিতে চায়
লেভিনস্কি পার্কের কাছেই একটি সুপার মার্কেটের মালিক ডেভিড এলকায়াম (৫৪)। ২০ বছর ধরে এই এলাকাকে একটু একটু করে বদলে যেতে দেখেছেন এলকায়াম। তবে এই পরিবর্তন নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই তার। তিনি বলেন, ‘আমার কাস্টমারদের একটা বড় অংশ এই সুদানি ও ইরিত্রীয় শরণার্থীরা। ওরা খুবই বন্ধুত্বপরায়ণ স্বভাবের মানুষ এবং কঠোর পরিশ্রমী। আমার চারজন কর্মচারী আছে, তাদের একজন আফ্রিকান। আসলে কী, আমি মনে করি, ওরা আমার বিজনেস পার্টনার।’

তবে এলকায়াম এ কথাও স্বীকার করেন, তার মতো সব ইসরাইলিই যে শরণার্থীদের ভালো চোখে দেখে, তা নয়। এর কারণ গায়ের রঙ। ইসরাইলিরা চায়, ওই কালোদের এ দেশ থেকে বের করে দেয়া হোক।

দক্ষিণ তেল আবিব সম্বন্ধে মতামত চাওয়া হয়েছিল আরেক দোকানের এক কর্মচারীর কাছ থেকে। প্রশ্ন শুনে সে মাথা ঝাঁকাল। সন্দেহভরা কুতকুতে চোখে তাকিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘কী বলতে চাইছ, আফ্রিকানদের কথা? আমি ওদের ব্যাপার কিসসু বলব না। আমি কিছু একটা বলি আর আমার জানালায় ঢিল পড়ুক আর কী।’ বলেই কর্মচারীটি কাউন্টারের পেছনে গিয়ে বসল আর ‘কিছুই হয়নি’ এমন একটা ভাব নিয়ে বিয়ারের গ্লাসে চুমুক দিতে থাকল।

সলোমন স্ট্রিটে আফ্রিকানদের ছোট ছোট কিছু সুপার মার্কেট আছে, সেখানে নিজের একটি দোকান আছে জ্যাকের। সেখানে ইসরাইলের পুরনো দিনের গানের সিডি এবং পর্নো ছবির ডিভিডি বিক্রি করা হয়। আশপাশে তার চারটি অ্যাপার্টমেন্ট আছে। সেগুলো ভাড়া দিয়েছেন শরণার্থীদের কাছে। তবে তার পছন্দ ইসরাইলি ক্লায়েন্টদের।

কেন? জানতে চাইলে জ্যাক বলেন, ‘আফ্রিকানরা হচ্ছে নোংরা। এমনিতে রাস্তাঘাটে ওদের দেখলে দেখবেন, বেশ ভালো পোশাক-আশাক পরে হাঁটছে। কিন্তু ওদের বাসাবাড়িতে ঢুকলে দেখা যাবে, নোংরার একশেষ। আর এসব লোক চুরিতেও ওস্তাদ। এমনকি ওদের চোরাই মালের বাজারও আছে।

অন্য চেহারা
তবে দক্ষিণ তেল আবিবই ইসরাইলি রাজধানীর আসল চেহারা নয়, এর অন্য একটি চেহারাও আছে। সেটাই বলা যাক।
নগরী হিসেবে তেল আবিব বলতে গেলে তরুণ। মাত্র শ’খানেক বছর আগে প্রতিষ্ঠা এর। ফলে এখানে নেই কোনো ঐতিহাসিক নিদর্শন, নেই প্রাচীন স্মৃতিস্তম্ভ। তারপরও প্রবল আকর্ষণক্ষমতা দিয়ে তেল আবিব বহির্বিশ্বের পর্যটকদের টানে। প্রতি বছর এখানে প্রায় ২৩ লাখ পর্যটক আসে।

কেন আসে এত পর্যটক, সে কি কেবল তেল আবিবের সুন্দর আবহাওয়া ও সুন্দর সমুদ্রসৈকতের টানে? কিছুটা তো বটেই, তবে সবটা নয়। তেল আবিব নগর কর্তৃপক্ষের এক মুখপাত্র বলেন, ‘তেল আবিবের স্পেশাল যদি কিছু থাকে, সেটা হলো এখানকার মানুষ। দে আর দ্য রিয়াল মনিউমান্ট। এই নগর সব সময় তার দরজা খোলা রেখেছে, থেকেছে সদাজাগ্রত, সপ্তাহে সাত দিন, প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা।’

কিভাবে, তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এই নগরে আছে এক হাজার ৭৪৮টি ক্যাফে, নাইট ক্লাব ও বিনোদনকেন্দ্র। প্রতি ২৩০ জন নাগরিকের জন্য একটি করে।’

এ-ই হলো তেল আবিব। অনুন্নত দক্ষিণ অংশ থেকে মাত্র ১০ মিনিট হেঁটে এলেই নগরকেন্দ্র। কী নেই এখানে? আছে উজ্জ্বল আলোয় ঝলমলে রথসচাইল্ড বুলেভার (প্রশস্ত রাজপথ) এবং হরেক বিনোদনের ব্যবস্থা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুবক তেল আবিববাসীর ভাষায়, ‘এখানে করার মতো অনেক কিছুই আছে, আছে অনেক অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ। এখানে আপনার স্বাধীনতা আছে, নিজের সত্যিকার রূপটিকে আবিষ্কার করার।’

এই যুবকের প্রধান আকর্ষণ সমকামীদের মেলা (গে পার্টি)। তেল আবিবের বিভিন্ন হোটেলে ও বিনোদনকেন্দ্রে এই মেলা প্রায়ই বসে। সমকামীদের অবাধ বিচরণক্ষেত্র হিসেবে তেল আবিবের পরিচিতি আছে। তেল আবিবের ওই যুবকটিও, অন্য অনেকের মতো, ওসব পার্টিতে হাজির থাকে। যুবকটি এমনিতে অনুন্নত দক্ষিণ তেল আবিবে কখনোই যায় না। তার মতে, ওটা হচ্ছে তেল আবিবের ‘খারাপ’ অংশ। কিন্তু সেখানকার বিখ্যাত ক্লাব দ্য ব্লক যেদিন গে নাইট আয়োজন করে, সেদিন সে যাবেই।

ইসরাইলে আফ্রিকান অভিবাসীদের সম্বন্ধে এ যুবকের অভিমত, ‘সহিংসতা বা ধনবৈষম্যের শিকার হয়ে ওরা দেশ ছেড়েছে, এটা ঠিক নয়। ওরা আসলে উন্নত জীবনের সন্ধানে একটি উন্নত দেশে এসেছে। রেসিডেন্স পারমিট পাওয়ার জন্য বলতে হয় তাই নিজেদের শরণার্থী বলছে। এরকম ঘটনা এখন ইউরোপেও ঘটছে।’

তার মতে, তেল আবিবের ওই অংশে মাদকাসক্তি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। মাদকাসক্তদের ভয়ে মানুষ ওখানে রাতে একা হাঁটতে ভয় পায়।

মৃত্যুর সাথে মোলাকাত
লেভিনস্কি পার্কের কাছেই একটি শরণার্থী শিবির। সেখান থেকে তেল আবিবের উন্নত অংশের বহুতল ঝলমলে ভবনগুলো চোখে পড়ে। শরণার্থী শিবিরটি যেখানে অবস্থিত তার চার পাশ জঞ্জালে ভরা – প্লাস্টিকের ব্যাগ ও বোতল, সুঁই, ছেঁড়া জুতা, সিগারেটের শেষাংশ, ছেঁড়া পুরনো কাপড়, গাড়ির ভাঙা টুকরা, রেজর ব্লেড ও ব্যবহৃত কনডম সবই আছে। প্রস্রাবের দুর্গন্ধে ভুর ভুর করছে চার দিক। সেখানে নিজের তাঁবুর বাইরে একটি নড়বড়ে চেয়ারে বসে ছিলেন নানা নামে এক নারী। তার হাতে সিগারেট, তিনি প্রাণপণ চেষ্টা করছেন ঘুম ঠেকাতে।

নানা নামের এই নারী এবং জনা চল্লিশেক ক্যাম্পবাসীর সবাই রাশিয়ান এবং সবাই হেরোইন অথবা অন্য কোনো মাদকে আসক্ত। কথা বলতে বলতে হাত বাড়ালেন নানা, ‘তুমি কি আমাকে কিছু টাকা-পয়সা দিতে পারবে? আমার পকেট একেবারে খালি। এখানে জিনিসপত্রের যা দাম!’

বিগত শতকের সত্তরের দশকে নানার পরিবার রাশিয়া থেকে ইসরাইল চলে আসে। নানা তখন কিশোরী। তারপর?

না, তার পরের কথা বলতে নারাজ এই মাদকাসক্ত নারী। তবে স্বীকার করেন, কয়েক দশক ধরে তিনি মাদক নিয়ে চলেছেন। বলেন, ‘আমি প্রতিদিন যতটা সম্ভব হেরোইন শট নিই। কতটা নেব সেটা নির্ভর করে পকেটের অবস্থার ওপর। এক শট হেরোইন নিতে ৫০ শেকেল লাগে। যদি পারতাম, তাহলে প্রতিদিন ১০০ শট নিতাম।’

আফ্রিকান শরণার্থী ও গৃহহীন মাদকাসক্তের দল তেল আবিব নগরীর ‘পেছনভাগে’ (এই এলাকাটিকে সাধারণভাবে এ নামেই ডাকা হয়) বসবাস করলেও তারা একেবারে অদৃশ্য, তা কিন্তু নয়। নগরবাসী ও পর্যটক সবাই কোনো-না-কোনোভাবে তাদের দেখা পায়। কারণ, আফ্রিকান শরণার্থীরা। নগরকেন্দ্র অথবা সমুদ্রসৈকতের কাছাকাছি কোনো হোটেলে ছোটখাট কাজ করে থাকে।

তেল আবিব পৌর কর্তৃপক্ষও আফ্রিকান শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করে আসছে। তাদের এক মুখপাত্র বলেন, দক্ষিণ অংশে অবকাঠামো, জনকল্যাণ, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও শিক্ষা খাতে পৌর কর্তৃপক্ষ কয়েক শ’ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। এ ছাড়া গত বছর সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব দিয়েছে যেন সরকার অভিবাসীদের ব্যাপারে একটা নীতিমালা করে। তবে এখন পর্যন্ত সরকারের সাড়া মেলেনি।

গৃহহীন ও মাদকাসক্তদের ব্যাপারে অবশ্য তেল আবিব পৌর কর্তৃপক্ষ বেশ নিরাসক্ত। তাদের মুখপাত্রের কথা, ‘এ সমস্যাটা সারা পৃথিবীর সব বড় নগরীতে আছে।’ ওদের ব্যাপারে পৌর কর্তৃপক্ষের নীতি কী জানতে চাওয়া হলেও জবাব পাওয়া যায়নি। ফলে অসংখ্য অভিবাসী প্রতিদিন মাদক গ্রহণ করছে আর মৃত্যুর সাথে করছে অকাল মোলাকাত।

Advertisements





সর্বশেষ খবর