মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

তুরস্কে ত্রিমুখী দ্বন্দ্ব-এম আবদুল হাফিজ

%e0%a6%8f%e0%a6%ae-%e0%a6%86%e0%a6%ac%e0%a6%a6%e0%a7%81%e0%a6%b2-%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%ab%e0%a6%bf%e0%a6%9cঅটোমান সভ্যতার ধ্বংসাবশেষের ওপর ধর্মনিরপেক্ষ আধুনিক তুরস্কের জনক কামাল আতাতুর্কের তুরস্ক যেভাবে অস্তিত্বে আসে, তাতে দেশটির জন্য উল্লিখিত পরিচিতির কোনোটিকেই উপেক্ষা করার উপায় নেই। দ্বাদশ শতাব্দীতে বাগদাদভিত্তিক আব্বাসীয় সভ্যতার পতনের পর খেলাফতের ভরকেন্দ্র ক্রমেই স্থানান্তরিত হয় পশ্চিম এশিয়া অভিমুখে।

অতঃপর কয়েক শতাব্দী ধরে তুরস্কেই তা থিতু হয়। আরব বিশ্ব থেকে ইসলামের নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা কার্যত অপসারিত হয় এশিয়া মাইনরে এবং সেখান থেকে বলকান হয়ে ইউরোপ অভিমুখে। তবে সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় খেলাফতে স্খলন ও পতনের ধারা। তা সত্ত্বেও বিশ্ব মুসলিম, বিশেষ করে উপমহাদেশের মুসলমানরা ইসলামী কর্তৃত্বের প্রতীক হিসেবে বরাবরই তার প্রতি দুর্বল ছিল এবং দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে স্বাধীনতা আন্দোলনের পাশাপাশি একটি খেলাফত আন্দোলন হয়েছিল।

অত্যন্ত স্পর্শকাতর ভূ-রাজনীতির অধিকারী আজকের তুরস্কের বিচিত্র ঘটনাপ্রবাহ—দেশের রাজনীতিতে ইসলামের প্রভাব, আধুনিক তুরস্কের অভ্যুদয়, দেশটির সেনাবাহিনীর সেক্যুলারিজমে আস্থা ও নীতিনির্ধারণে আর্মির প্রাধান্য—এ সব কিছুরই যৌক্তিকতা রয়েছে। যৌক্তিক কারণ রয়েছে, কেন দেশটির আর্মি অভ্যুত্থানে প্রবৃত্ত হয়। তবে তুর্কি সামরিক বাহিনী অভ্যুত্থান করলেও তা নিছক ক্ষমতা দখলের জন্য। দেশটির ইতিহাস, ভৌগোলিক অবস্থান, আদর্শ, মূল্যবোধ ও অভিজ্ঞতা বারবার সামরিক বাহিনীকে প্ররোচিত করে লব্ধ কোনো কিছুকে না হারাতে।

তুরস্কের সর্বশেষ অভ্যুত্থানপ্রচেষ্টা, যা এ বছরেরই মধ্য ভাগে সংঘটিত হয়েছিল, যখন সামরিক বাহিনীর অংশবিশেষ গত জুলাইয়ের শেষ ভাগে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের সরকারকে উত্খাত করতে রাজধানী আঙ্কারা ও ইস্তাম্বুলে যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ও সাঁজোয়া বহর মোতায়েন করে। বিদ্রোহীরা পার্লামেন্ট ভবন আক্রমণ ও গুলি বিনিময় করে, যাতে আড়াই শর মতো লোক নিহত হয়। সামরিক বাহিনীর বেশির ভাগ শীর্ষ পদবিধারীরা এই নাটকীয় ও অস্পষ্ট বিদ্রোহে অংশ না নিতে চাইলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অভ্যুত্থান স্তিমিত হয়ে আসে।

কিছুদিন আগেই এরদোয়ান এক বিপুল নির্বাচনী বিজয়ের পর সামরিক বাহিনীতে প্রথাগতভাবে শুদ্ধি অভিযান চালানোয় আর্মি এরই মধ্যে দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং মনোবল হারিয়ে অভ্যুত্থান করার অবস্থায় ছিল না। তা ছাড়া আর্মি তো তাদের স্বার্থবিরোধী মারাত্মক কিছু না ঘটলে অনুগতই থাকে। এরদোয়ানের শুদ্ধি অভিযানে ক্ষুব্ধ আর্মি অনুমান করতে বাধ্য হয় যে সম্ভবত এরদোয়ানের মতো ইসলামিস্ট প্রেসিডেন্ট আর্মির মাত্রাতিরিক্ত সেক্যুলারিজম প্রবণতায় অসন্তুষ্ট। তা ছাড়া যেভাবেই হোক আর্মি নিজেদের ‘গণতন্ত্র ও সেক্যুলারিজমের’ অতন্দ্রপ্রহরী হিসেবে নিজেদের সেই আতাতুর্কের আসন থেকেই প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছে। তাই সাম্প্রতিক সময়ে অভ্যুত্থান প্রচেষ্টাটি ছিল অপ্রত্যাশিত।

২০০৭ সালের পর এরদোয়ান সাবেক মিত্র ও সমর্থক ফেতুল্লাহ গুলেনের ‘হিজমেত’ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। এই আন্দোলনের নিভৃতচারী নেতা ফেতুল্লাহ গুলেন ১৯৯১ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। ২০০৭ সালেও যখন একটি অভ্যুত্থানপ্রচেষ্টা হয়েছিল গুলেনই সেটাকে দমন করেন। তার পর থেকে আর্মিকে স্পষ্টই অবদমিত মনে হয়। প্রকাশ্যে সুফি মতবাদের এই ‘ইসলামিস্ট’ নেতা বা সংস্কারকের যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক ছাড়াও আরো কিছু দেশে ভক্ত ও সমর্থক আছে। যদিও এরদোয়ানের বিশ্বাস, জুলাইয়ের অভ্যুত্থানপ্রচেষ্টায় গুলেনের হাত আছে।

আর্মির প্রতিপত্তিকে হ্রাস করতে জুলাই অভ্যুত্থানের অবদান আছে। এরদোয়ানের শুদ্ধি অভিযান ছাড়াও ২০০৮ সাল থেকে শুরু তুরস্কে ক্ষমতার নতুন বিন্যাস আর্মিকে কিন্তু তাদের সীমাবদ্ধতা বুঝিয়ে দিতে পেরেছে। ক্ষমতার নতুন সমীকরণে গুলেনের এরদোয়ানের সঙ্গে এক শিবিরে থাকার সম্ভাবনা কম। নতুন বিন্যাসে যতই পরিবর্তন আসুক, ঐতিহাসিক কারণেই ইসলাম-সেক্যুলারিজম দ্বন্দ্ব থেকেই যাচ্ছে। তবে আর্মির ঐতিহ্যগত প্রভাবের হ্রাস-বৃদ্ধি অনেকটাই নির্ভর করবে এরদোয়ানের দক্ষতার ওপর। জুলাইয়ের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার পর এরদোয়ান তাঁর সেই দক্ষতার সম্যক পরিচয় তুলে ধরেছেন।

তবু প্রশ্ন থেকে যায় যে পাশ্চাত্য মৈত্রীর নেতৃস্থানীয় যুক্তরাষ্ট্র কেন ন্যাটোর অন্তর্ভুক্ত একটি দেশের ‘পৃষ্ঠে ছুরিকাঘাতের মতো’ অবিশ্বাসের কাজে লিপ্ত হবে। উল্লেখ্য, অতিসম্প্রতি আঙ্কারা মস্কোর সঙ্গে তার বৈরিতার অবসান ঘটিয়েছে। রুশ-তুরস্ক এই সম্পর্কোন্নতির ফলে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান কিছুদিন আগেও এক বৈরী রাশিয়াকে ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও অংশীদার’ আখ্যায়িত করেছেন। তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদ্রিম এমনও উক্তি করেছেন যে তাঁর দেশ রুশ সমর্থিত সিরিয়ার সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছারও বিপক্ষে নয়।

ব্যর্থ অভ্যুত্থানের দৃশ্যপটে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানকে এখনই দলমত-নির্বিশেষে তাঁর পথের কাঁটাগুলোকে দূর করতে সংকল্পবদ্ধ মনে হয়। তিনি এরই মধ্যে তুরস্কের বিশাল আমলাতন্ত্রকে শুদ্ধিকরণের আওতায় এনেছেন। বিচার বিভাগে তিনি মৃত্যুদণ্ডেরও পুনঃ প্রবর্তন করেছেন। প্রতিরক্ষা বাহিনী থেকে তিনি ছয় হাজারের মতো পদস্থ কর্মকর্তাকে অপসারিত করেছেন। সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিনদের পরিবর্তিত করা হয়েছে অথবা পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। শতাধিক বিচারক গ্রেপ্তার হয়েছে এবং কয়েক হাজার বিচারককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। ৩০ জন গভর্নর চাকরিচ্যুত। ২০টি টেলিভিশন চ্যানেল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এরদোয়ানের প্রতি অনানুগ্যতরা পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য তালিকাবদ্ধ হয়েছেন।

এতে কোনো সন্দেহরই অবকাশ নেই যে তুর্কি প্রেসিডেন্ট ব্যর্থ অভ্যুত্থানকে ব্যবহার করে তাঁর সব মতাদর্শগত প্রতিপক্ষদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছেন। এর অন্তর্ভুক্ত শুধু গুলেন সমর্থকরাই নয়, যে কেউ প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের বিরুদ্ধবাদীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে, তারাই তাঁর প্রতিশোধস্পৃহার লক্ষ্যবস্তু বা শিকার হবে। প্রেসিডেন্ট এরই মধ্যে বেশ কিছু সেক্যুলারবিরোধী দলের নেতা, যাঁরা কুর্দ স্বাধীনতাকামীদের সঙ্গে সংলাপের ডাক দিয়েছে, তাদের চাকরিচ্যুত করেছেন। অভ্যুত্থানকালে ও তার অব্যবহিত পর প্রেসিডেন্ট শুদ্ধির নামে নির্যাতনের যে স্টিমরোলার চালিয়েছেন—তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে ১৯ জুলাইয়ে তিনি জরুরি অবস্থার ঘোষণা দেন। এ ব্যবস্থার অন্তরালে তুরস্কে যে কি ঘটবে বা ঘটতে থাকবে তারও হদিস পেতে অনেক সময় লাগবে।

লেখক : সাবেক মহাপরিচালক, বিআইআইএসএস

Advertisements

Add Comment

Click here to post a comment