জাতীয়

ঢামেক মর্গে লাশের স্তূপ নিচ্ছে না আঞ্জুমানে

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) মর্গ। দুই মাসেরও বেশি সময় এখানকার সব এসি নষ্ট। পাঁচটি ফ্রিজের দুটি বিকল। আর তিনটি বিদেশি ও জঙ্গিদের লাশের দখলে। এদিকে কিছু দিন ধরে বেওয়ারিশ লাশ নিচ্ছে না আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম। ফলে জমে থাকা লাশ পচে গলে নষ্ট হচ্ছে। মর্গ থেকে ভেসে আসছে মানুষ পচা উৎকট গন্ধ। মানুষ পচা গন্ধে নাক চেপেও দাঁড়াতে কষ্ট হচ্ছে লোকজনের। এদিকে এ মর্গে রাখা বেওয়ারিশ লাশগুলো পচে-গলে এতটাই বিকৃত হচ্ছে যে, শনাক্ত করার কোনো উপায় থাকছে না।

জানা গেছে, ঢামেক মর্গের পাঁচটি ফ্রিজের মধ্যে দুটি দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট। আর তিনটি জঙ্গি, বিদেশি ও অজ্ঞাত লাশের দখলে। মর্গের তিনটি এসির সব ক’টিই নষ্ট। পর্যাপ্ত ফ্যানও নেই। প্রতিদিন ৮-১০টি লাশের ময়নাতদন্ত হয়। ঢামেক মর্গে প্রতি বছর রাজধানীর অধিকাংশ থানা ছাড়াও অন্যান্য এলাকা থেকে আসা তিন হাজারেরও বেশি লাশের ময়নাতদন্ত হয়, যা অন্যান্য মেডিকেল কলেজের তুলনায় ছয় গুণেরও বেশি। অথচ নষ্ট হওয়া এসব ফ্রিজ ও এসি মেরামতের কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। এদিকে বেওয়ারিশ লাশগুলোও আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামের লোকজন না নেয়ায় শুক্রবার পর্যন্ত মর্গে জমেছে প্রায় ৫০টি লাশ। ফ্রিজের বাইরে লাশগুলো একটি রুমে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। এসব লাশ পচে-গলে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।

মর্গ সূত্র জানায়, মর্গের ফ্রিজে চারটি জঙ্গির, চারটি ভারতীয় নাগরিকের, একটি দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিকের এবং ফার্মগেটের ক্যাপিটাল মার্কেটের মালিক খোকন নন্দী ওরফে খোকা বাবুর লাশ রয়েছে। এ ছাড়া আরও ১৫টি অজ্ঞাত লাশ এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যাওয়া ২৫টি নবজাতকের লাশ রয়েছে। ফ্রিজের বাইরে এসব লাশ একটি রুমে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। এক সপ্তাহের বেশি সময় লাশগুলো ফেলে রাখায় তাতে পচন ধরে মর্গের চৌহদ্দিতে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। চার পাশের পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। মর্গে এত লাশ পড়ে থাকার নেপথ্যের কারণ জানতে চাইলে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের একজন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক জানান, হাসপাতাল কিংবা রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে আসা অজ্ঞাত লাশের ময়নাতদন্ত শেষে পরিচয় খুঁজে পেতে লাশ কয়েক দিন মর্গে রাখা হয়। মর্গে রাখার পরও পরিচয় শনাক্ত না হলে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম বেওয়ারিশ হিসেবে তা দাফন করে। কিন্তু ঈদের পর আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের লোকজন লাশগুলো না নেয়ায় এ সমস্যা হচ্ছে।

আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সহকারী পরিচালক মাহমুদুল হাসান বলেন, বেওয়ারিশ লাশগুলো নিয়ে জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়। কিন্তু কিছু দিন ধরে বৃষ্টিতে জুরাইন কবরস্থানে পানি জমে আছে। যে কারণে সেখানে লাশ দাফন করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, শনিবার আমরা কবরস্থান এলাকা পরিদর্শন করব। লাশ দাফনের উপযোগী হলে লাশগুলো নিয়ে দাফন করা হবে। জুরাইন কবরস্থানের মোহরার মো. শোয়েব হোসাইনের কাছে বেওয়ারিশ লাশ দাফন না করার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জুরাইন কবরস্থানে মোট ১৭ একর জমি রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ একর ব্যক্তিমালিকানার কবর। এ ছাড়া পাঁচ একর জমিতে অবশিষ্ট লাশ কবর দেয়া হয়। বছরের পর বছর কবর দেয়ায় সেখানে জায়গাও নেই। গেন্ডারিয়া বাজারসংশ্লিষ্ট অবশিষ্ট সাড়ে সাত একর জমিতে বর্তমানে লাশ দাফন করা হয়। সেখানে বেওয়ারিশ লাশও দাফন করা হয়। তিনি বলেন, বর্ষা মৌসুমে এখানে লাশ দাফনের জন্য মাটি খোঁড়া যায় না। একটু মাটি খুঁড়লেই পানি ওঠে। এ কারণে গোরখোদকরাও কবর খুঁড়তে রাজি হন না। ফলে বর্ষার তিন মাস রাজধানীর অন্য কোনো কবরস্থানে দাফনের ব্যবস্থা করতে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কর্মকর্তাদের অনুরোধ জানানো হয়। তিনি জানান, অতি বৃষ্টির কারণে লাশগুলো পানিতে ভেসে ওঠে। ঢামেক মর্গের মরচুয়ারি অ্যাসিস্ট্যান্ট সিকান্দার আলী বলেন, নবজাতকসহ প্রায় ৫০টি বেওয়ারিশ লাশ মর্গে পড়ে আছে। ঈদের আগে পড়ে থাকা ১১টি লাশ নিয়েছিল আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম। এরপর বারবার যোগাযোগ করা হলেও তারা লাশ নিতে আসেননি। লাশগুলো পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। ফলে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, এসি এবং ফ্রিজ মেরামতের জন্য একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা মেরামতের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, ফ্রিজ ও এসি নষ্ট থাকায় লাশ পচে-গলে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে আলামতও। সূত্র- যুগান্তর