মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

জীববৈচিত্র্য চাই, মানুষবৈচিত্র্য চাই না!-ড. হারুন রশীদ

%e0%a6%a1-%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%a8-%e0%a6%b0%e0%a6%b6%e0%a7%80%e0%a6%a6একবিংশ শতাব্দীতে মানুষের সচেতনতা এই পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তারা শুধু নিজেরা বাঁচতে চায় না, বেঁচে থাকার অন্যান্য উপকরণ ও পারিপার্শ্বিকতা রক্ষার জন্য তারা সমান তত্পর। জীববৈচিত্র্য রক্ষার তাগিদ মানুষকে করেছে আরো উন্নত, সমৃদ্ধ। কারণ এর মধ্য দিয়ে মনুষ্যত্ববোধের উন্মেষ ঘটে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতি ঘণ্টায় পৃথিবী থেকে তিনটি করে প্রাণীর প্রজাতি বিলুপ্ত হয়। বছরে বিলুপ্ত হয় ২০ হাজারটি। অথচ পৃথিবীর ৩০০ কোটি মানুষ উপকূলে আর ১৬০ কোটি মানুষ বনাঞ্চলে বসবাস করে। যাদের জীবিকার বড় উৎস আসে জীববৈচিত্র্য থেকে। বাংলাদেশেও বিপুলসংখ্যক মানুষ জীববৈচিত্র্যের ওপর নির্ভর করে টিকে আছে। ফলে টেকসই উন্নয়নের জন্য জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য জাতিসংঘ, সরকার, এনজিওসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। এমনকি ব্যক্তিপর্যায়েও অনেক কাজ হচ্ছে। যদি একজন মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির কথা ধরি, তাহলে পায়ের নিচে পিঁপড়া পড়লেও আমরা সাবধানে পা ফেলি। আবার একটি ঘাসফড়িং কিংবা প্রজাপ্রতি ধরি খুবই আদরে, যাতে প্রাণীটির কোনো ক্ষতি না হয়। কিন্তু সেই মানুষ যখন নিজেরই প্রতিবেশী অন্য মানুষ, যাদের ধর্ম পরিচয় সংখ্যাগরিষ্ঠের থেকে আলাদা, তাদের বেলায় উল্টো প্রতিক্রিয়া দেখাই, সেটি হয়ে ওঠে খুবই দুঃখজনক।

নাসিরনগর ও গোবিন্দগঞ্জে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনা আমাদের মনুষ্যত্ববোধকে নানা প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। শুধু ধর্ম বা গোষ্ঠী পরিচয়ের কারণে একই দেশের জল-হাওয়ায় বাস করা মানুষের ওপর ভিন্ন আচরণ করা হবে—এটা মেনে নেওয়া যায় না। গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের সঙ্গে কী হয়েছে তা সবাই জানেন। গাইবান্ধার সাঁওতালি গ্রামে চলছে হাহাকার। নিজ দেশের পুলিশি তাণ্ডবে তারা দিশাহারা। শ্যামল হেমব্রম, মঙ্গল মার্ডি ও রমেশ টুডু নামে কমপক্ষে তিনজন সাঁওতাল কৃষক নিহত হয়েছেন। এই হত্যাকাণ্ডের মূলে রয়েছে ভূমিবিরোধ।

জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশ সাফল্য দেখাচ্ছে। সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি দেশ-বিদেশে প্রশংসিত হচ্ছে। কিন্তু যে ধর্মকে বর্ম বানিয়ে জঙ্গিরা তাদের অপতত্পরতা চালিয়ে যাচ্ছে সেই ধর্মকেই সামনে এনে যদি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করা হয়, তাহলে জঙ্গিবাদ দমন হবে কী করে? সাম্প্রদায়িক মনমানসিকতা পোষণ আর জঙ্গি দমন তো একসঙ্গে হতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সংখ্যালঘুদের রক্ষার দায়িত্ব সবার। যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে সেই দায়িত্ব কি আমরা পালন করছি—এই আত্মজিজ্ঞাসা আজ জরুরি হয়ে পড়েছে।

সাঁওতাল আদিবাসীদের ওপর হামলা হয়েছে। আদিবাসী বলি আর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী যা-ই বলা হোক না কেন, তারা এ দেশেরই নাগরিক, অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মতো তাদেরও এ দেশের জল-হাওয়া সমানভাবে স্পর্শ করে। এসব নৃগোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতি। রয়েছে নিজস্ব আচার-অনুষ্ঠানও। ঐতিহাসিককাল থেকেই তারা এ দেশে বসবাস করছে। এক সমৃদ্ধ সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে তারা আমাদের সংস্কৃতিকে করছে বৈচিত্র্যপূর্ণ ও পরিপুষ্ট। কিন্তু  দুঃখজনক হলেও সত্য, তারা যেন নিজভূমে পরবাসী। সাংবিধানিকভাবে এসব জনগোষ্ঠীর অধিকার সংরক্ষণের বিষয়টি তাই কোনোভাবেই উপেক্ষার নয়।

প্রতিটি নৃগোষ্ঠীরই রয়েছে দীর্ঘ ধারাবাহিক ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ধর্ম, ভাষা। কোনো কোনো নৃগোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব ভাষার লিপি বা বর্ণমালা। আধুনিক সভ্যতার ক্রমবিবর্তনে শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় কাঠামো বলয়ে বিলীন ও জাতিগত বৈশিষ্ট্যানুযায়ী স্থানান্তর কৃষি পদ্ধতিজনিত অনবরত স্থানান্তর ক্রমেই তাদের বিচ্ছিন্ন ও লঘু নৃগোষ্ঠীতে পরিণত করেছে। সংখ্যালঘুতার কারণে প্রতারিত ও বঞ্চিত জীবনের ভার বইতে বইতে গুটিয়ে গেছে নিজেদের মধ্যে। কখনো বা বিসর্জন দিয়েছে আত্মপরিচয়, নাম, গোত্র এমনকি ধর্মবিশ্বাস পর্যন্ত। অধিকারবঞ্চিত এসব নৃগোষ্ঠীর অনেকে বর্ণহীন বলেই তাদের জীবনের সুমহান বাণী লিপিবদ্ধ হয়নি মাতৃভাষায়। তাই তো তারা আজ বিলুপ্তির চৌকাঠে দাঁড়িয়ে। কিন্তু লিখিত বর্ণমালা না থাকা সত্ত্বেও নিসর্গকেন্দ্রিক জীবনে তাদের উৎসব, পার্বণ, নৃত্য, গীতিনাট্য, গীতিকা, পালা ইত্যাদি শিল্প ও নানা রকম ক্রীড়া-কসরত ইত্যাদি গড়ে ওঠে জুমকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে। প্রতিটি জনগোষ্ঠীর মধ্যেই রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্যের বিপুল সম্ভার।

বাংলাদেশের নৃগোষ্ঠীগুলোর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে তাদের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। দুঃখজনক হচ্ছে, নৃগোষ্ঠীগুলোর সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও সাহিত্যের সামগ্রিক রূপটি বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বাঙালিদের কাছে অনেকটাই অপরিচিত রয়ে গেছে। বাংলাদেশের নৃগোষ্ঠী জনসাধারণ প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করে। এর পেছনেও সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। সূদুর অতীতকালে তারা যখন এ অঞ্চলে অভিবাসন শুরু করে তখন পূর্ব বাসস্থলের ভৌগোলিক আবহের সঙ্গে যে অঞ্চলের মিল পেয়েছে সেখানেই তৈরি করেছে আবাসন। অর্থাৎ পূর্ব ঐতিহ্য অনুযায়ী তারা বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আবাস গড়ে তোলে। এর ফলে ভৌগোলিকভাবে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বাঙালিদের সঙ্গে তাদের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। এভাবে মূল জনস্রোতের জীবন, সংস্কৃতি ও ভাষা বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে ক্রমেই তাদের দূরত্ব স্থায়ী হয়।

এ ছাড়া অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আগ্রাসনে নৃগোষ্ঠী নর-নারী ও তাদের সংস্কৃতি ক্রমেই বৃহত্তর জনজীবনধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তা ছাড়া বাঙালিদের সঙ্গে নৃগোষ্ঠীর ভাষা, বিভিন্ন সামাজিক ও পারিবারিক প্রথা, রীতিনীতি, ধর্মীয় কৃত্যাদি, আচার-অনুষ্ঠান, খাদ্য, সাংস্কৃতিক ও কৃষিপদ্ধতির কারণেও দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া ভৌগোলিক পরিমণ্ডল অভিন্ন না হওয়ায় এক অঞ্চলের সঙ্গে অন্য অঞ্চলের জনগণের মধ্যে ভাষাগত পার্থক্য সূচিত হয়। তাই বাংলাদেশের এক অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা অন্য অঞ্চলের মানুষের কাছে দুর্বোধ্য। নৃগোষ্ঠীগুলোর প্রাচীন ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ভাষারীতি কালের স্রোতে বাহিত হয়ে চলেছে তাদের সমাজে। নিজেদের গুটিয়ে রাখতে, তাদের আচরিত জীবনযাপন পদ্ধতি ও ভাষারীতি যতটা সম্ভব আঁকড়ে থাকতে তারা সদা তত্পর। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত নৃগোষ্ঠীর সঙ্গে ভৌগোলিক, ভাষাতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক পার্থক্যের কারণেও দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। আর এই দূরত্বই সামগ্রিকভাবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূল স্রোতধারা থেকে করেছে বিচ্যুত। অথচ তাদের ঔজ্জ্বল্যটুকু ধরে রাখতে পারলে, সর্বসাধারণ্যে তুলে ধরতে পারলে শুধু সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীই নয়, সামগ্রিকভাবে উপকৃত হবে সবাই। এ জন্যই বৈচিত্র্যপূর্ণ ও সারল্যে ভরা জীবনাচারের অধিকারী ক্ষুদ্র এসব নৃগোষ্ঠী সম্পর্কে সবাইকে কৌতূহলী করে তোলা একান্ত অপরিহার্য। এসব কারণেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতির বিষয়টিকে গৌণ করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। আর সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা গেলেই নানা ধর্ম-বর্ণ-বৈচিত্র্যের মানুষের একসঙ্গে বসবাসে কোনো সমস্যা হবে না। আমরা যদি জীববৈচিত্র্য চাই, তাহলে মানুষবৈচিত্র্যও চাইতে হবে। কারণ বিষয়টি একে অপরের পরিপূরক।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

harun_press@yahoo.com

Advertisements

Add Comment

Click here to post a comment