অপরাধ/দুর্নীতি

‘চাচার হাত-পা-মাথা টুকরা টুকরা কইরা ট্রাঙ্কে লাশ ঢুকাইয়া বইস্যা থাকি ’

যাত্রাবাড়ী থানার চাঞ্চল্যকর মামলার ভিকটিম রফিকুল ইসলাম রুবেলকে হত্যাকাণ্ডের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন আঁখি আক্তার ঝুমা। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর থেকে বিকাল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক সাব্বির ইয়াসির আহসান চৌধুরীর খাসকামড়ায় রোমহর্ষক জবানবন্দি দেন ঝুমা।

জবানবন্দীতে ঝুমা বলেন, ‘চাচা খাটে শুইয়া ছিলো, আমি ফ্লোরে বইসা আদা-রসুন বাটতেছিলাম। চাচায় হঠাৎ পিছন থেইক্ক্যা জড়াইয়া ধরল আমারে। এরপর খারাপ প্রস্তাব দিল। খালি ঘর। কী করমু বুঝতে পারতাছিলাম না। একসময় কোনো কিছু চিন্তা না কইরা হাতের পুঁতা দিয়া ওনার মাথায় বারি মারি। বুঝতে পারি নাই মইরা যাইবো। অনেক রক্ত দেইখ্যা পরথম ঘাবরায়া গেছিলাম। পরে ঠাণ্ডা মাথায় বাজার থেইক্ক্যা ২৫শ টাকা দিয়া একটা ট্রাঙ্ক কিন্যা আনি। লাশটারে পরথম পলিথিনে প্যাঁচায়া ট্রাঙ্কে ভরতে চাইছিলাম। কিন্তু লম্বা শরীরডা ট্রাঙ্কে না ঢোকায় বঁটি দিয়া হাত-পা-মাথা টুকরা টুকরা কইরা কাটি। এরপর পলিথিনে প্যাঁচায়া ট্রাঙ্কে লাশ ঢুকাইয়া বইস্যা থাকি। বিছানার কাপড় দিয়া রক্ত মুইচ্ছা হেইডা আর আমার জামা-কাপড় ওই ট্রাঙ্কেই রাহি। রাইত সাড়ে আটটার দিকে হেয় (স্বামী মো. মোজাম্মেল হক) আইলে পুরা কাহিনি খুইল্লা কই। চাচার লগে থাকা টাকা, সোনা হেয় নেয়। লাশসহ সারা রাইত আমরা বইস্যা থাকি। পরেরদিন একটা পিকআপে কইরা লাশভর্তি ট্রাঙ্কডারে আমরা নেত্রকোনা লইয়া যাই। হেইখানে নিয়া লাশটারে মাটিতে পুইত্তা ফেলি।’

এদিকে গত ১৯ জুলাই সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে রাজধানীর পূর্ব রামপুরার ৭৮/২৪ নম্বর ভাড়া বাড়িতে প্রবাসী মো. রফিকুল ইসলাম রুবেলকে হত্যা করেন তারই চাচাত ভাইয়ের মেয়ে ঝুমা। একই দিন একই আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন ঝুমার স্বামী মোজাম্মেল ও ভাই মো. জাকিরুল। ৬৪ পৃষ্ঠার এই জবানবন্দি প্রদানের পর আদালত তাদের তিনজনকেই কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা যাত্রাবাড়ী থানার এসআই বিলাল আল আজাদ জানান, ভিকটিম রুবেল বেড়াতে এসে গত ২১ জুলাই যাত্রাবাড়ী থেকে নিখোঁজ হন। এ বিষয়ে যাত্রাবাড়ী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন ভিকটিমের পরিবার। পরবর্তী সময়ে ভিকটিমের স্ত্রী পপি বাদী হয়ে একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেন। তদন্তে নেমে জানা গেছে, ঘটনার দিন রুবেলের মোবাইল নম্বর রামপুরা এলাকা থেকে বন্ধ হয়। ওই মোবাইল নম্বরের সূত্র ধরে আরও জানা যায়, ৭৮/২৪ পূর্ব রামপুরার একটি বাসা ছিল তার শেষ অবস্থান। তিনি ওই বাসায় গিয়ে জানতে পারেন, ভাড়াটিয়ারা তাদের মালামাল নিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে গেছে। সাথে তারা একটি বড় ট্রাঙ্কও নিয়ে গেছে। এতে আরও সন্দেহ বাড়ে। পরে ওই ভাড়াটিয়া মোজাম্মেলের গ্রামের বাড়ি গিয়ে মাটির নিচে মেলে নিখোঁজ রুবেলের লাশ।

প্রবাসী রুবেল নিখোঁজের বিষয়ে অনুসন্ধানে নেমে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ সিলেট, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে যথাক্রমে মোজাম্মেল, ঝুমা ও জাকিরুলকে।

তিনি আরও জানান, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা যাত্রাবাড়ী থানার এসআই বিলাল আল আজাদ তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে সিলেটের কোতোয়ালি থানাধীন একটি আবাসিক হোটেল (কোরাইশী হোটেলের ২০৬ নম্বর কক্ষ) থেকে গত সোমবার মোজাম্মেলকে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে তার দেওয়া তথ্যমতে হত্যার মূল আসামি ঝুমাকে একই দিন নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানাধীন নবীগঞ্জ এলাকায় ঝুমার স্বামীর খালোতো বোনের বাসা থেকে এবং রাজধানীর রামপুরা এলাকা থেকে জাকিরুলকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।

আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করলেও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই বিলাল বলেন, নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডে ওই ৩ জন ছাড়া আরও কয়েকজন জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ভিন্ন দাবি তুলে ধরা হয়। গতকাল ওয়ারী বিভাগের ডিসি ফরিদ উদ্দিন আহম্মেদ সংবাদ সম্মেলনে জানান, টাকা ও স্বর্ণালঙ্কারের লোভে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে রুবেলকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। ধারালো বঁটি দিয়ে লাশ টুকরো টুকরো করে ট্রাঙ্কে রাখে আসামিরা। পরবর্তী সময়ে পিকআপ দিয়ে ঢাকা থেকে নেত্রকোনায় নিয়ে ধানক্ষেতের ভেতরে মাটিচাপা দিয়ে লাশ গুম করে ঝুমা এবং তার স্বামী ও ভাই।

ঘটনার বর্ণনায় ডিসি ফরিদ উদ্দিন আহম্মেদ জানান, নিহত রুবেল দুবাই প্রবাসী। ঝুমা তার পূর্ব পরিচিত। দুবাই থেকে বাংলাদেশে আসার পর গত ২১ জুলাই ঝুমাদের বাসায় বেড়াতে যান রুবেল। এরপর তার সঙ্গে থাকা টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার হাতিয়ে নিতে ঝুমাদের বাসায় রুবেলকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। ঝুমাকে এই হত্যায় সহায়তা করে তার স্বামী মোজাম্মেল হক। এরপর রুবেলের লাশ কয়েক টুকরো করে একটি ট্রাঙ্কে ভরে রাখে। এ সময় ভিকটিম রুবেলের কাছ থেকে ৩ ভরি ওজনের একটি স্বর্ণের চেন, এক জোড়া কানের দুল, একটি আংটি ও নগদ সাড়ে তিন লাখ টাকা নিয়ে যায় আসামিরা। লাশ গুম করার জন্য পরদিন সকালে একটি পিকআপ ভাড়া করে বাড়ির অন্য মালামালসহ আসামিদের গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ থানায় গভীর রাতে পৌঁছায়। সেখানে মোজাম্মেলের গ্রামের বাড়ির পেছনে ধানক্ষেতের পাশে পরিত্যক্ত জায়গায় রুবেলের লাশ মাটিচাপা দিয়ে রাখে। স্থানীয় পুলিশ ও বাসিন্দাদের সহযোগিতায় ২ আগস্ট ভিকটিমের অর্ধগলিত লাশ ওই ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার করা হয়। এরপর গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে স্বর্ণালঙ্কার, হত্যার সংশ্লিষ্ট পাটা-পুঁতা, বঁটি, ট্রাঙ্ক, জুতা ও ব্যাগ জব্দ করা হয়।

Advertisements