খেলা-ধুলা

চট্টগ্রাম টেস্ট খেলতে চাননি সাকিব!

রঙিন ক্রিকেটের দুনিয়াতে বাংলাদেশ যতটা নিজেদের শক্তিশালী হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছে, সাদা পোশাকের ক্রিকেটে সেখানে অনেক পিছিয়ে। এই পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম টেস্ট খেলা। এই কম খেলার আরেকটি কারণ হলো প্রতিপক্ষ হিসেবে বৃহৎ শক্তিগুলোর অনীহা।

তাই তো দেখা যায় টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর ১৬ বছর পর বাংলাদেশ প্রথম ভারতে খেলার ডাক পায়। তাও এক টেস্টের জন্য। অস্ট্রেলিয়া ২০১১ সালে বাংলাদেশে সফরে আসলেও শুধু রঙিন পোশাকের ম্যাচ খেলে যায়। সাদা পোশাকের টেস্ট ম্যাচ তারা পরে খেলার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই পরেটা এসেছে অনেক টালবাহানার পর। মাত্রই খেলে গেছে দুই টেস্টের সিরিজ। বাংলাদেশের টেস্ট সিরিজ মানেই দুই টেস্ট। তিন টেস্টের সিরিজ খেলেছে খুবই কম। এতই কম যে যা দেখতে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের প্রয়োজন পড়বে। পাটীগণিতের হিসেবে তিনটি। ২০০৩ সালে পাকিস্তান, ২০০৭ সালে শ্রীলঙ্কা ও এবং ২০১৪ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। বকি সবই দুই টেস্টের সিরিজ। এর মাঝে বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়ারে ম্যাচের সংখ্যাও কম নয়। যে কারণে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মাঝে বেশি সংখ্যক টেস্ট ম্যাচ খেলতে না পারার একটা আফসোস বিরাজমান ছিল সব সময়। বলা যয়ায় টেস্ট ক্রিকেটের বনেধি পরিবারের সদস্য হলেও বাংলাদেশের জন্য রাস্তা কিন্তু মসৃণ ছিল না।

দুর্গম রাস্তা পাড়ি দিয়েই তাদের এগিয়ে চলতে হয়েছে। এভাবে চলতে চলতেই বাংলাদেশে সাদা পোশাকেও নিজেদের ধীরে ধীরে উন্নতির পথে নিতে শুরু করেছে। ইংল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা ও অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে তারা তার নিদর্শনও রেখেছে। এই তিন শক্তিশালী দলের বিপক্ষে বাংলাদেশের জয় বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশকে নিয়ে অন্যরা নতুন করে ভাবতে শুরেু করেছেন। যে ভাবনায় আছে বাংলাদেশকে নিয়ে হেলাফেলা করার দিন শেষ। দিতে হবে যথেষ্ট গুরুত্ব। রব উঠেছে আগামীতে বাংলাদেশের টেস্ট সিরিজ যেন তিন টেস্টের হয়। একদিনের ক্রিকেটের দলপতি মাশরাফি ইতিমধ্যে সে অভিপ্রায় ব্যক্তও করেছেন। বিসিবির পক্ষ থেকেও বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। কিন্তু সেখানে দলের অন্যতম সেরা ক্রিকেটার নম্বর ওয়ান অলরাউন্ডার সাকিবের টেস্ট ক্রিকেট থেকে বিশ্রামে চলে যাওয়া বাংলাদেশের চলার পথে কাঁটা বিছিয়ে দিয়েছে। এ যেন স্ববিরোধিতার শামিল।

বাংলাদেশের ভাবনায় যেখানে টেস্ট ম্যাচ বাড়ানোর চেষ্টা, সেখানে সাকিবের ভাবনায় মনে হয় বাংলাদেশ খুব বেশি টেস্ট ম্যাচ খেলে ফেলেছে। এই সংখ্যা কমিয়ে আনা প্রয়োজন। একজন ক্রিকেটারের জন্যতো আর ম্যাচ কমিয়ে আনা সম্ভব নয়, তাই নিজেই বিশ্রামে চলে গেছেন। বিসিবিও তাকে বিশ্রাম দিয়েছে! তা হলে কোনটা সত্য? বাংলাদেশ কম টেস্ট খেলে, না সাকিব টেস্ট বেশি খেলেন? দুই পক্ষই নিজ নিজ জায়গায় নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। বাংলাদেশের সন্তান হয়েও সাকিব এখন বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ হয়ে গেছেন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঢাকা টেস্টে দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখানোর পর তিনি নাকি চট্টগ্রাম টেস্ট খেলতে চাননি বলে বিসিবির একটি সূত্রে জানা গেছে। সেই টেস্টে সাকিব মোটেই ভালো করতে পারেননি। পরে দক্ষিণ আফ্রিকার মতো কঠিন একটি সফরকে সামনে রেখে তিনি নিজের স্বার্থে নিজেকে গুটিয়ে বিশ্রামে রেখেছেন। যদিও তিনি তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন বাংলাদেশকে আরো বেশি সার্ভিস দেয়ার জন্যই তার এই সাময়িক বিরতি। কিন্তু পরিসংখ্যান কি বলে?

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে সাকিবের কথা সঠিক প্রমাণিত হয় না। সেখানে বাংলাদেশের কম টেস্ট খেলার বিষয়টিই স্বচ্ছ পানির মতো সামনে ভেসে ওঠে। ২০০০ সালে বাংলাদেশ টেস্ট পরিবারের সদস্য হওয়ার পর এখন পর্যন্ত টেস্ট খেলেছে মাত্র ১০২টি। গড়ে বছরে ছয়টি। সবচেয়ে বেশি আটটি টেস্ট খেলেছে ২০০৮ সালে। এ বছর এখন পর্যন্ত খেলেছে সাতটি টেস্ট। ২০১০ সালেও খেলেছিল সাতটি টেস্ট। মাঝে একবার ( ২০১০ সালের জুন মাস থেকে ২০১১ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত) ১৪ মাস টেস্ট খেলেনি বাংলাদেশ। এই সময়ে অন্য দলের পরিসংখ্যান না-ই উল্লেখ করা হলো। একজন ক্রিকেটারের উদাহরণই যথেষ্ট। ইংল্যান্ডের অ্যালিস্টার কুক ২০০৬ সালের মার্চে টেস্টে অভিষেকের পর সাড়ে ১০ বছরে এখন পর্যন্ত তিনি টেস্ট খেলেছেন ১৪৭টি। গড়ে বছরে ১৪টি। টেস্ট খেলায় দল হিসেবে বাংলাদেশ কুকের চেয়েও পিছিয়ে আছে। কুক কিন্তু কখনো ক্লান্তির কথা বলেননি। খেলেই চলেছেন। সেখানে কুকের পরে ২০০৭ সালে সাকিবের টেস্ট অভিষেক। ১০ বছরে তিনি ৫১ টেস্ট (গড়ে বছরে পাঁচটি) খেলেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। তাই তার বিশ্রাম চাওয়া। বিষয়টি কিন্তু অবাক করার মতোই। কুকের মতো বছরে ১৪টি করে টেস্ট খেললে তো সাকিবকে খোঁজেই পাওয়া যেত না! তাই স্বাভাবিক কারণে প্রশ্ন উঠতেই পারে সাকিব কী আসলেই ক্লান্ত!

কুক আর সাকিবকে পাশাপাশি দাঁড় কারলে কিন্তু সাকিবের ক্লান্তির বিষয়টি হাস্যকর হয়ে ওঠে। সাকিবের পক্ষে আবার যুক্ত আসতে পারে তিনি তো ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি বোলিংও করে থাকেন। কুক তো আর বোলিং করেন না। কিন্তু এখানেও যুক্তি খণ্ডানোর আছে। সাকিবের চেয়ে কুক কিন্তু চারটি কম তিনগুণ বেশি টেস্ট খেলেছেন। এ সময়ে তিনি রান করেছেন ১১৬২৯। সেঞ্চুরি আছে ৩১টি, হাফ সেঞ্চুরি ৫৫টি। সেঞ্চুরিগুলোর মাঝে ডবল সেঞ্চুরি আছে আবার চারটি। একটি আবার তিনশ’ ছুঁই ছুঁই। সেখানে সাকিবের রান ৩৪২৩। আর বল হাতে প্রায় ২০১৫ ওভারের মতো বোলিং করে উইকেট নিয়েছেন ১৮৮টি। ২২ গজের উইকেটে দু’জনের তুলনা করলে কুকই কিন্তু বেশি সময় থেকেছেন। একটি জায়গায় অবশ্য সাকিব কুকের চেয়ে বেশি সময় ২২ গজের উইকেটে বেশি থেকেছেন। তা হলো কুড়ি ওভারের ক্রিকেট। সাকিব জাতীয় দল ছাড়াও ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ খেলতে বিশ্বব্যাপী ঘুরে বেড়ান। সেখানে কুক জাতীয় দলের হয়ে মাত্র চারটি ম্যাচ খেলেছেন। তাকে কেউ সাকিবের মতো ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ খেলতে ডাকে না! এখানে তিনি অচল! একদিনের ম্যাচও খেলছেন না ২০১৪ সাল থকে। বিশ্ব ভ্রমণ করে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ খেললেও সাকিব এটিকে ক্লান্তির কারণ বলে মনে করেন না। ক্লান্তির সব কারণ টেস্ট ক্রিকেট! কুক ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ খেলতে বিশ্বব্যাপী চষে বেড়ান না বলে ক্লান্তি তাকে এসে ভর করে না।!

শুধু কুকের উদাহরন কেন, স্বদেশি মুশফিকুর রহিমের উদাহরণও সামনে নিয়ে আসা যায়। ২০০৫ সালে টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক। এখন পর্যন্ত খেলেছেন ৫৬ টেস্ট। দলের নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যান। আবার উইকেট কিপার। এখন প্রতিপক্ষরা বড় ইনিংস গড়তে না পারলেও মুশফিকুরে ক্যারিয়ারের শুরুতে প্রতিপক্ষকে অলআউটই করা যেত না। চারশ, পাঁচশ’ এমনকি ছয়শ’ রান করে ইনিংস ঘোষণা করত। মুশফিককে এ রকম লম্বা সময় কিপিং করে পরে আবার ব্যাটিংও করতে হতো। ২০১৩ সালে গল টেস্টে তো শ্রীলঙ্কার ইনিংসে ১৩৫ ওভার কিপিং করে মুশফিক পরে নিজ করেছিলেন ২০০ রান। শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয় ইনিংসে আবার তাকে কিপিং করতে হয়েছিল ৮৩ ওভার। বলা যায় পাঁচ দিনের টেস্টের চার দিনই তাকে মাঠে থাকতে হয়েছিল। এই দুই দায়িত্বের পাশাপাশি মুশফিককে অধিনায়কত্বের দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে। তিনটি দায়িত্বই তিনি আনন্দে চিত্তে পালন করছেন, উপভোগ করছেন। তার চাপমুক্ত রাখতে বরং বিসিবি কিপিং করা থেকে বিরত রাখতে চাচ্ছে। কিন্তু মুশফিক নিজ থেকে ছাড়তে রাজি না। তার পরও কিন্তু মুশফিকের মাঝে ক্লান্তি নেই। বরং কুকের উদাহরণ টেনে কম টেস্ট খেলার কারণে মুশফিকের কণ্ঠে আফসোসও ঝরেছিল। সব ক্লান্তি তাই সাকিবের মাঝেই। মুশফিকের ক্লান্তি না থাকার কারণ কুকের মতোই। তাকে যে বিশ্বব্যাপী কুড়ি ওভারের ক্রিকেট খেলতে এক দেশ থেকে আরেক দেশে যেতে হয় না। তাহলে কী দাঁড়াল? ক্লান্তির কারণ কী কুড়ি ওভারের ক্রিকেট নয়। কিন্তু সাকিব তো তা মনে করেন না। তার কাছে যে সাদা পোশাকের ক্রিকেটই যত ক্লান্তির কারণ। কিন্তু তার এ রকম সিদ্ধান্ত কি বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে বেশি বেশি খেলার পথকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলবে না।