অপরাধ/দুর্নীতি জাতীয়

ঘটনা মীমাংসা হয়েছিল সোনার দুটি ব্রেসলেটে!

বনানীতে দুই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ধর্ষণের ঘটনায় মামলা হওয়ার আগেই একবার সমঝোতা হয়েছিল। সোনার দুটি ব্রেসলেটের বিনিময়ে এই সমঝোতা করা হয়। ব্রেসলেট দুটির দাম ছিল দুই লাখ টাকা। আপন জুয়েলার্সের উত্তরা শোরুম থেকে ব্রেসলেট দুটি দেয়া হয়। দুই মেয়ের পক্ষে পাপ্পু, সৌরভ ও নাদিম নামে তিন যুবক এসে ব্রেসলেট দুটি গ্রহণ করেন। পরে পিকাসো রেস্টুরেন্টে বসে দুই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর সঙ্গে ঘটে যাওয়া বিষয়টি মীমাংসা করা হয়। এক নম্বর আসামি সাফাত আহমেদের জবানবন্দিতে পাওয়া গেছে এ তথ্য।

এ ছাড়া অন্য সব আসামি, একাধিক সাক্ষী, দুই শিক্ষার্থীর জবানবন্দি এবং পুলিশের তদন্তে সাফাত আহমেদ, তার বন্ধু নাঈম আশরাফ, সাফাতের গাড়ি চালক বিল্লাল হোসেন ও বডিগার্ড রহমত আলীকে ঘটনার জন্য দায়ী করা হয়েছে। তবে তিন নম্বর আসামি সাদমান সাকিব ঘটনার শিকার হয়েছেন। প্রধান আসামির আমন্ত্রণে সাকিফ ঘটনাস্থলে যাওয়ায় তিনি ফেঁসে যান।

জবানবন্দি এবং অভিযোগপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২৮ মার্চ ঘটনার তিন দিন পর মামলার বাদিনীর পরিচিত সৌরভ ঘটনাটি মীমাংসার জন্য বলেন। পরে সৌরভ, পাপ্পু ও নাদিম নামে তিনজন মিলে সাফাতদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। ওই বৈঠকে বিষয়টি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখতে সমঝোতা হয়। এই সমঝোতার জন্য উল্লিখিত তিনজন দুটি ব্রেসলেট নেন সাফাতের কাছ থেকে। ওইদিনই ধারণকৃত গোপন ভিডিও (১ মিনিট ২ সেকেন্ড) ডিলিট করা হয়েছিল। অভিযোগপত্রে ও জবানবন্দির তথ্য অনুযায়ী, এক নম্বর আসামি বাদিনীকে এবং দুই নম্বর আসামি বাদিনীর বান্ধবীকে একাধিকবার ধর্ষণ করে। আর তিন নম্বর আসামি সাদমান সাকিফের সঙ্গে বাদিনী ও তার বান্ধবীর পরিচয় ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সাদমান সাকিফ ধর্ষণ বা অন্য আসামিদের কোনো প্রকার সহায়তাও করেননি। সাফাতের জন্মদিনে অন্য অতিথিদের মতোই সাকিফ এসেছিলেন।

বাদিনীর জবানবন্দিতে উল্লেখ আছে, প্রধান আসামি সাফাতই তাদের জম্মদিনের দাওয়াত করেন। তাদের বলেছেন এখানে অনেক ভদ্র অতিথি আসবেন। ঘটনার রাতে বাদিনী তার এক বান্ধবী (ধর্ষিতা) ছাড়াও সাফাতদের সঙ্গে আরো দু’জন মেয়ে ছিল। এদের একজনের নাম নাজিয়া ও অপজনের নাম তানজীলা।

অভিযোগপত্রের তথ্য পর্যালোচনা করে জানা যায়, বাদিনী তিন নম্বর আসামি সাদমান সাকিফকে দুই বছর থেকে চেনেন। পিকাসোতে আসা-যাওয়ার সূত্র ধরে তার সঙ্গে পরিচতি হন। তবে কখনো আপত্তির কিছুই হয়নি। বন্ধুত্ব ছিল। এই পিকাসোতে আসতেন এক নম্বর আসামি সাফাত। পরে তার সঙ্গে পরিচয় ঘটে বাদিনীর। ওই সূত্র ধরেই বাদিনী সাফাতের সঙ্গে চলাফেলা শুরু করেন।

মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন, সাফাতের সঙ্গে বাদিনীর নিয়মিত ফোনালাপ হতো। জন্মদিনে সাফাতই বাদিনী ও তার বান্ধবীকে দাওয়াত করেন। চালক বিল্লাল তাদের (দুই মেয়ে) সাফতের গাড়িতে করেই নিয়ে আসেন। অনুরূপভাবে সেই রাতে সাকিফকেও দাওয়াত করা হয়। এই অনুষ্ঠানে শাহরিয়ার, স্নেহাসহ আরো কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। জানা যায়, সাকিফ ওইদিনই (সন্ধ্যায়) দিল্লির একটি আইটি ফেয়ার থেকে ঢাকায় ফিরে আসেন। জবানবন্দিতে জানিয়েছেন, তিনি সরল বিশ্বাসে সাফতের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে রাত ৯টার দিকে উপস্থিত হন।

আসামিদের জবানবন্দির তথ্য অনুযায়ী, প্রধান আসামি সাফাতসহ ভিকটিম, তার বান্ধবী ও অন্যরা হোটেল রেইন ট্রিতে সুইমিং শেষে কেক কেটেছেন। রুফটপে কেক কাটা শেষে ডিজেপার্টির মতো ব্ল–টুথে উচ্চস্বরে গান ছেড়ে ড্যান্স ও মদপান করেছেন। সাকিফ মদপান করতেন না। তাই তিনি একটু দূরে থাকেন। কিন্তু মেয়েদের সঙ্গে অন্যদের অস্বস্তিকর পরিবেশ দেখে তিনি ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। পরে রাতে সাফাত তাকে অন–রোধ করে বলেন, ‘সাকিফ তুমি তাড়াতাড়ি চলে আসো। আমার বিপদ হয়ে গেছে।’ পরে সাকিফ পাশেই গুলশানের বাসা থেকে ঘটনাস্থলে গিয়ে সব বিষয় জেনে আঁতকে ওঠেন।

জবানবন্দিতে সাফাত বলেছেন, বাদিনীর সঙ্গে তার আগের পরিকল্পনা ছিল যে তারা একসঙ্গে সুইমিং করবে। এটা বাদিনীর পছন্দ। এ কারণে মেয়েটি সুইমিংয়ের প্রস্তুতি হিসেবে একটা ব্যাগ নিয়ে যায়। সেখানে কিছু কাপড় চোপর ছিল। যা বাদী নিজেই তার জবাননিতেও উল্লেখ করেছেন। এদিকে ঘটনার রাতে সাকিফ দ্বিতীয়বারের মতো উপস্থিত হয়ে দেখতে পান আসামি নাঈম মারছিল শাহরিয়ারকে। তিনি সরল মনে তাদের থামাতে গেলে নাঈম তাকেও চড় মারেন। পরে সাকিব পরিস্থিতি খারাপ দেখে তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থল ত্যাগ করে বাসায় চলে যান।

বনানীর রেইন ট্রি হোটেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রী ধর্ষণ মামলার অভিযোগ গঠনের শুনানি আজ। মামলার প্রধান আসামি সাফাত আহমেদসহ পাঁচ আসামিকে কারাগার থেকে আজ আদালতে হাজির করা হবে। মামলার তদন্ত সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তথ্য অনুয়ায়ী, জন্মদিনের পার্টির কথা বলে ২৮ মার্চ রাতে বনানীর রেইন ট্রি হোটেলে ডেকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া দুই তরুণীকে ধর্ষণ করেন সাফাত আহমেদ ও তার বন্ধু নাঈম আশরাফ। বনানী থানায় দায়ের করা মামলায় ৮ জুন সাফাত আহমেদ ও বন্ধু নাঈম আশরাফ ওরফে আবদুল হালিমসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়। অপর তিন আসামি হলেন সাফাতের পরিচিত ছোট ভাই সাদমান সাকিফ, সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল হোসেন ও দেহরক্ষী রহমত আলী। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার আবদুল বাতেন বলেন, সব তথ্য পর্যালোচনা শেষে মামলার অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে। যেখানে সাফাত, নাঈম, সাফাতের চালক ও দেহরক্ষি মূল অভিযুক্ত।

মামলার বাদিনীর সঙ্গে কথা বললে তিনি অভিযুক্তদের সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন। সাফাত ও নাঈমের পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তারা কোনো মন্তব্য করেননি। তবে সাদমান সাকিফের মা বলেছেন, মামলার এজাহার, অভিযোগপত্র, জবানবন্দিসহ কোথাও বলা নেই আমার ছেলে জড়িত বা সে অপরাধ করেছে। আমি তার সঙ্গে কারাগারে দেখা করেছি। কথা বলার সময় আমাকে একটা কথায় বলেছে, ‘মা, আমি কী আইনের বিচার পাব না? সাকিফের মা বলেন, সব তথ্য পর্যালোচনা করে আদালত সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন বলেই আমি বিশ্বাস করি।’