গাজীপুর ঢাকা বিভাগীয় সংবাদ

গাজীপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত তিন ছাত্রীর গ্রামে শোকের মাতম

নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর: সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত গাজীপুর মহানগরের উত্তর সালনা ও বাওরাইদ গ্রামের তিন বান্ধবীর গ্রামে শোকের মাতম চলছে। অদক্ষ চালক আর ফিটনেসবিহীন গাড়িতে নিজের সন্তানদের পড়াশুনার জন্য বিদ্যালয়ে পাঠাবে কিনা এ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ছেন ওই গ্রামের অভিভাবকেরা।

মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে ওই গ্রামের ফারজানা আক্তার শিখার বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিবেশীরা তার বাড়িতে ভীড় করেছেন। তাদের মুখে আলোচনা সমালোচনা তাদের সন্তানেরা পরিবহনযোগে কীভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনিশ্চিত যাত্রা করবে, আবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বাসার উদ্দেশে রওয়ানা হবে?

চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন ভঙ্গ হল শিখা ও তার বাবা মায়ের:
ফারজানা আক্তার শিখা বাওরাইদ গ্রামের ফরহাদ হোসেনের প্রথম কন্যা সন্তান। সে গাজীপুর সদর উপজেলার রাজেন্দপুর ইকবাল সিদ্দিকী স্কুল এন্ড কলেজের বিজ্ঞান প্রথম বর্ষের ছাত্রী। তার বাবা ফরহাদ হোসেন বলেন, জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও সেকেন্ডারী স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় সাড়ে চার পয়েন্টের বেশি জিপিএ পেয়েছে। কন্যার ইচ্ছাতেই তাকে কলেজে ভর্তি করেছিলাম। তার ইচ্ছা ছিল সে বড় হয়ে চিকিৎসক হবে। কিন্তু অনিশ্চিত সড়ক যোগাযোগ তার চিকিৎসক হওয়া দূরের কথা আমার কন্যাকে বাসায় ফিরতে দেয়নি। কলেজ থেকে সে লাশ হয়ে বাসায় ফিরেছে।

ছুটির দরখাস্তে সুপারিশ নেয়াই ছিল মায়ের সাথে শেষ কথোপকথন:
শিখার মা সেলিনা আক্তার বলেন, নাকে সমস্যার কারণে চিকিৎসার জন্য শনিবার ও রোববার সে কলেজে যায়নি। সোমবার কলেজের যাওয়ার আগে ছুটির দরখাস্তে আমাকে সুপারিশ করতে বলে। আমি স্বাক্ষর ছাড়া কিছুই বঝি না। নিজে প্রীতি শিল্প গ্রুপে চাকরী করি। তার বাবা একটি খাবার হোটেলে খাবার পরিবেশনের কাজ করে। ইচ্ছে ছিল স্বামী স্ত্রী মিলে কন্যাকে তার ইচ্ছানুযায়ী উচ্চ শিক্ষিত করব, চিকিৎসক বানাবো। কিন্তু সে ইচ্ছায় বাধা দিল সড়ক দুর্ঘটনা। তিনি বলেন, আমাদের মতো এখন কোনো বাবা-মা তাদের সন্তানদের জন্য উচ্চ আশা করবে না। যেখানে সন্তানের জীবনের নিশ্চয়তা নেই সেখানে আশা করে কী হবে?

একই গ্রামের শাহজামালের দু’কন্যা সন্তানের মধ্যে সাদিয়া আফরিন রিমি বড়। শাহজামাল বলেন, তার কন্যা জেএসসিতে এ প্লাস এবং এসএসসিতে ৪ পয়েন্ট ৮২ পেয়েছে। তারও ইচ্ছা ছিল সে চিকিৎসক হবে। গত এক মাস যাবত সে কলেজে ক্লাশ শুরু করেছে। সকাল আটটা থেকে ক্লাশ শুরু হত। চিকিৎসক হওয়ার জন্য প্রাইভেট পড়াসহ তার পেছনে মাসে ১২ হাজার টাকা খরচ হতো। সড়ক আমার মেয়েকে নিয়ে গেল। কার পেছনে টাকা খরচ করব?

ভোর থেকে রান্না করবে না মা জরিনা খাতুন:
রিমির মা জরিনা খাতুন বলেন, প্রতিদিন ভোর পাঁটটায় উঠে মেয়ের জন্য রান্নাবান্না শুরু করতেন। সাতটার মধ্যে খাওয়া দাওয় শেষে বইপত্র নিয়ে সড়ক পর্যন্ত ইগয়ে দিয়ে আসতেন। একই গ্রামের আরও দু’তিনজন একসাথে কলেজে যেত। আমার মেয়ের শেস যাওয়া ছিল সোমবার। আমাকে আর ভোরে উঠে রান্নাবান্না করতে হবে না, বইয়ের ব্যাগ নিয়ে সড়ক পর্যন্ত এগিয়ে দিতে হবে না। সড়কে যারা মানুষ নিয়ে চলাচল করে, যারা এসব পরিচালনা করে তাদের কী কিছুই হবে না? এ প্রশ্ন করেই মুর্ছা যান মা জরিনা খাতুন।

সন্তানকে অভিভাবকেরা লেখাপড়ায় পাঠিয়ে হারাতে চাইবে না:
একই গ্রামের আনসার ব্যাটালিয়ন ইউসুফ আলী বলেন, তার ছেলে মাফুজ রাজেন্দ্রপুর শাহীন স্কুলের সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে। বিদ্যালয়ে পাঠালেই ফিরে না আসা পর্যন্ত দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। সড়কে বিশেষ করে আঞ্চলিক যানবাহনগুলো অদক্ষ, প্রশিক্ষনবিহীন লোকজন চালিয়ে থাকে। অপ্রাপ্তবয়ষ্ক ছেলেরা এগুলো চালিয়ে তাকে। যানবাহনের মালিক ও প্রশাসনের লোকদের সামনে দিনের পর দিন তারা যানবাহন চালিয়ে যাচ্ছে। কোনো প্রতিকার হচ্ছে না।

ভাল বন্ধু কেড়ে নিয়েছে:
বাওরাইদ গ্রামের সুমাইয়া আক্তার গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড কলেজে একাদশ শ্রেণীতে পড়েন। তিনি বলেন, শিখা প্লে থেকে এসএসসি পর্যন্ত তার সাথে পড়েছে। দুর্ঘটনার আগের দিন বিকেলে সে শিখা, রিমিকে নিয়ে এলাকায় ঘুরেছে। তারা দু’জনেই খুব ভাল বান্ধবী ছিল তার। দুর্ঘটনা শুধু বাবা মায়ের বুকই খালি করেনি ভাল বন্ধু কেড়ে নিয়েছে।

একই গ্রামের কৃষক নূরুল ইসলাম বলেন, অর্থলোভী যানবাহন মালিক, চাঁদাবাজ ও প্রশাসনের লোকদের কারণে সাধারণ মানুষের যানবাহন চলাচল চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। ফিটনেসবিহীন যানবাহনগুলো প্রকাশ্যে চলাচল করছে।

একই গ্রামের গৃহিণী কুলসুমা আক্তার বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী এমনিতেই কম। দুর্ঘটনায় একই সাথে একই কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের তিনজন নারী শিক্ষার্থীর অকালে ঝড়ে যাওয়ায় আমাদের দেশের জন্য অপুরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল।

প্রসঙ্গত, সোমবার দুপুর আড়াইটার দিকে গাজীপুর মহানগরের ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মাস্টারবাড়ি এলাকায় ট্রাক লেগুনার মুখোমুখি সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত ও চারজন আহত হন। নিহতদের মধ্যে রাজেন্দ্রপুর ইকবাল সিদ্দিকী স্কুল এন্ড কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। শিখা ও রিমি ছাড়াও তাদের আরক সহপাঠী খাদিজা আক্তার ঘটনাস্থলেই নিহত হয়।

গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল শেখ বলেন, গাজীপুর জেলায় সড়ক নিরাপত্তা ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে দুটি শিফটে মোট ২০টি চেক পোস্টের কার্যক্রম চলমান। এর মধ্যে দিনে আটটি এবং রাতে ১২টি। একটি দুর্ঘটনায় তিন নারী শিক্ষার্থীসহ পাঁচজন নিহতের ঘটনার পর থেকে চেকপোস্টের তথা দুর্ঘটনা প্রতিরোধ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে। কী কারণে এমন দুর্ঘটনা ঘটলো সে বিষয়টিও জেলা পুলিশ তদন্ত করবে এবং তার প্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

গাজীপুর সদর উপজেলার রাজেন্দ্রপুর ইকবাল সিদ্দিীকী স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ ইকবাল সিদ্দিকী বলেন, তার কলেজে মঙ্গলবার মাধ্যমিক পর্যায়ে পূর্ব নির্ধারিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনায় তার কলেজের তিন ছাত্রী নিহতের ঘটনায় উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীসহ অন্য সকল শিক্ষার্থীরা শোক পালন করেছে। পঠন পাঠন বন্ধ ছিল।

তিনি বলেন, বুধবার সকাল ১০টা থেকে ১১ টা পর্যন্ত দুর্ঘটনাস্থলের কমপক্ষে পাঁচ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে নিরাপদ সড়কের দাবীতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হবে। মহাসড়কের আশপাশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এ কর্মসুচীতে অংশগ্রহণ করবে।

গাজীপুর মহানগরের বাওরাইদ গ্রামের দুই বান্ধবী রিমি ও শিখা দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। তাদের সাথে তাদের আরেক বান্ধবী উত্তর সালনা গ্রামের খাদিজা আক্তারও নিহত হন।