slider অর্থনীতি-ব্যবসা জাতীয়

কোরবানির চামড়া নিয়েও কারসাজি!

রাজশাহীতে এবার কোরবানির চামড়া বিক্রি হয়েছে পানিদরে! অভিযোগ পাওয়া গেছে, এবার কারসাজি করে চামড়ার দাম কমিয়ে ফেলা হয়েছে। ছলচাতুরি করে কমমূল্যে চামড়া কেনার চক্রান্ত বাস্তবায়ন করেছে একটি সিন্ডিকেট।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহীতে এবার কোরবানির চামড়ার দাম ছিল গেল কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। মসজিদ-মাদ্রাসা কমিটির কাছে দান করা চামড়াগুলোর দামও ওঠেনি ভালো। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বেশি দরে চামড়া কিনে প্রতিবছরই তাদের লোকসান গুণতে হয়। এ জন্য এবার তারা বেশ ‘সতর্ক’ হয়েই চামড়া কিনেছেন।

গতবছর ঢাকার বাইরে প্রতিফুট গরুর চামড়া ৪০ টাকা ও খাসির চামড়া সারা দেশেই ২২ টাকা দরে কিনেছেন ব্যবসায়ীরা। এবারও তারা একই দর চূড়ান্ত করে নিয়েছিলেন সরকারের কাছ থেকে। অন্য বছর সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দরে চামড়া বিক্রি হলেও এবার তা হয়নি। ফড়িয়াদেরও দৌরাত্ম্য ছিল এবার কম।

ফলে চামড়া কেনার সময় ব্যবসায়ীরা এবার বেমালুম চেপে গিয়েছেন সরকার নির্ধারিত দাম। কোথাও কোথাও চামড়া বিক্রি হয়েছে নির্ধারিত দামেরও চেয়েও কম টাকায়। গেল কয়েকটি কোরবানির ঈদে চামড়া এতো কম মূল্যে বিক্রি হতে দেখা যায়নি। অন্য বছরগুলোর তুলনায় এবার মৌসুমি ব্যবসায়ীর দাপটও ছিল কম।

ফলে চামড়ার বাজারে ‘রাজত্ব’ করেছেন প্রকৃত ব্যবসায়ীরাই। তারা চামড়া বিক্রেতাদের বলেছেন, গত বছরের চামড়ার প্রায় অর্ধেক এখনো রয়ে গেছে ঢাকার ট্যানারিগুলোতে। তাছাড়া ট্যানারিগুলো স্থানান্তর করতে গিয়েও টালমাটাল ব্যবসায়ীরা। ফলে নতুন করে চামড়া কেনার আগ্রহ নেই তাদের। তারা চামড়া কিনছেন ঝুঁকি নিয়ে। ট্যানারি মালিকরা চামড়া না নিলে তারা লোকসান গুণবেন। এ জন্য তারা চামড়া বেশি দামে কিনতে পারছেন না।

চামড়া বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছর রাজশাহীতে গরুর যে চামড়া দুই হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে, সে মাপের চামড়া এবার ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আর গত বছর যে চামড়া এক হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে, সেগুলো এবার ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

এদিকে খাসির চামড়া এবার মাত্র ৫০ থেকে সর্বোচ্চ ২০০ টাকায় কিনেছেন ব্যবসায়ীরা। ভেড়ার চামড়া বিক্রি হয়েছে মাত্র ২০ থেকে ৫০ টাকায়।

গ্রামে চামড়া সাধারণত মসজিদ-মাদ্রাসায় দান করা হয়। মসজিদ-মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটিই চামড়া বিক্রি করে থাকে। আর শহরে কোরবানিদাতারাই চামড়া বিক্রি করে সে টাকা দুস্থদের মাঝে বিতরণ করে দেন। পঁচে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় প্রায় সবাই এবার কম দামেই চামড়া বিক্রি করেছেন।

এদিকে ঈদের দিন দুপুরের আগে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বেশি দরে চামড়া কিনতে শুরু করেছিলেন। কেউ কেউ কিনেছেনও। কিন্তু পরবর্তীতে তারাও আর বেশি দরে চামড়া কেনেননি। দুপুরের পর মৌসুমি আর প্রকৃত ব্যবসায়ীদের দামের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য হয়নি। তবে দুপুরের আগে যেসব মৌসুমি ব্যবসায়ী একটু বেশি দরে চামড়া কিনেছেন, তারা গুণেছেন লোকসান।

কয়েকজন কোরবানিদাতা জানান, বেশি সময় ধরে রাখলে চামড়া নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই বাধ্য হয়েই অল্পমূল্যে চামড়া বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। রাজশাহী মহানগরীর তেরোখাদিয়া এলাকার বাসিন্দা সামশুল করিম বলেন, ৭৮ হাজার টাকা মূল্যের গরুর চামড়া তিনি বিক্রি করেছেন মাত্র সাড়ে ৪শ’ টাকায়। তার অভিযোগ, সিন্ডিকেট করে ব্যবসায়ীরা চামড়ার দাম কমিয়েছেন।

তবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করেন রাজশাহী চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রউফ। তিনি বলেন, হাজারিবাগ থেকে চামড়া কারখানাগুলো গুটিয়ে ফেলা হয়েছে। এখনও সাভারে স্থানান্তরিত কারখানাগুলোর নির্মাণ কাজ শতভাগ শেষ হয়নি। ফলে কোরবানির পশুর সব চামড়া সেখানে নিয়ে প্রক্রিয়াজাত করার মতো জায়গা ও ব্যবস্থা হয়নি। এ কারণে এবার আমাদের চামড়া কেনার আগ্রহ ছিল কম। আর চাহিদা কমায় কমেছে দাম।

তবে ভিন্ন কথাও শোনা গেছে অন্য চামড়া ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে। তারা বলেছেন, দু’বছর ধরে ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে রাজশাহীর ব্যবসায়ীদের বহু টাকা পাওনা রয়েছে। তাই তারা ছিলেন পুঁজি সংকটে। তাছাড়া ঢাকায় চামড়া পাঠিয়ে এবারও টাকা পাওয়া যাবে কি না তা নিয়েও তারা ছিলেন অনিশ্চয়তায়। বেড়েছে লবণেরও দাম। তাই লোকসান এড়াতে তারা একজোট হয়েই বেশি দরে চামড়া কেনেননি।