মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

কে হচ্ছেন হোয়াইট হাউসের পরবর্তী বাসিন্দা-তারেক শামসুর রেহমান

তারেক শামসুর রেহমানটান টান উত্তেজনার মধ্য দিয়ে আজ মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। কে হতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট—হিলারি ক্লিনটন, নাকি ডোনাল্ড ট্রাম্প? এ নিয়ে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করতে পারেননি। একসময় নির্বাচনের ১০ দিন আগেও ধারণা করা হয়েছিল, হিলারি হতে যাচ্ছেন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট! জনমত জরিপগুলো তা-ই বলছিল। তখন পর্যন্ত হিলারি এগিয়ে ছিলেন কয়েক পয়েন্টের ব্যবধানে। কিন্তু এফবিআই কর্তৃক হিলারি ক্লিনটনের ই-মেইল তদন্ত করার ঘোষণা পুরো দৃশ্যপটকে বদলে দেয়। হিলারি কিছুটা পিছিয়ে পড়েন। তবে দুই দিন আগে তাঁর অবস্থান আরো শক্তিশালী হয়েছে। শেষ মুহূর্তে এফবিআই তাঁকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। এর পরও কথা থেকে যায়। প্রতিবারের মতো এবারও ‘ব্যাটেলগ্রাউন্ড স্টেটগুলোর’ ভোটারদের মতামত নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে। এখানেই সিদ্ধান্ত হবে, কে হতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট। সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের স্টেটগুলো ‘লাল’ ও ‘নীল’ রঙে বিভক্ত অর্থাৎ কোনো কোনো স্টেটে রিপাবলিকানদের প্রাধান্য বেশি, ভোটাররা এখানে বরাবর রিপাবলিকানদের পক্ষেই ভোট দেন। আবার কোনো কোনো স্টেটে বরাবরই ডেমোক্র্যাটদের প্রাধান্য বজায় থাকে। তাঁরা ভোট দেন ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। কিন্তু নির্বাচনী পর্যবেক্ষকরা ১১টি স্টেটকে চিহ্নিত করেছেন, যেখানে ভোটাররা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকেন। এই স্টেটগুলোকে বলা হচ্ছে ‘ব্যাটেলগ্রাউন্ড স্টেট’ বা ‘সুইং স্টেট’। এগুলো হচ্ছে কলোরাডো, ফ্লোরিডা, আইওয়া, মিসিগান, নেভাদা, নিউ হ্যাম্পশায়ার, নর্থ ক্যারোলাইনা, ওহাইয়ো, পেনসিলভানিয়া, ভার্জিনিয়া ও উইসকনসিন। চূড়ান্ত মুহূর্তে এসব স্টেটের ভোটাররা যাঁকে ভোট দেবেন, তিনিই যাবেন হোয়াইট হাউসে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের নিয়মটা হচ্ছে ভোটাররা ভোট দেবেন ওই স্টেটের জন্য নির্ধারিত নির্বাচকমণ্ডলীকে (যেমন, ক্যালিফোর্নিয়ায় রয়েছে ৫৫ জন, ফ্লোরিডায় ২৯ জন)। আর নির্বাচকমণ্ডলী ভোট দেবেন হিলারিকে নতুবা ট্রাম্পকে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, একটি স্টেটে যে দল সাধারণ ভোটাভুটিতে বিজয়ী হয়েছে অর্থাৎ দলের নির্বাচকমণ্ডলীর পক্ষে যাঁদের ভোট বেশি পড়েছে, তিনি ওই স্টেটের সব নির্বাচকমণ্ডলীর ভোট পেয়েছেন বলে গণ্য করা হয়। এ কারণেই ওই সব ব্যাটেলগ্রাউন্ড স্টেটের গুরুত্ব অনেক বেশি। ফ্লোরিডার ২৯, পেনসিলভানিয়ার ২০, ওহাইয়োর ১৮, মিসিগানের ১৬, নর্থ ক্যারোলাইনার ১৫ নির্বাচকমণ্ডলীর ভোট পুরো দৃশ্যপটকে বদলে দিতে পারে। আর তাই নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে থেকে হিলারি ও ট্রাম্প ব্যস্ত ছিলেন এসব ব্যাটেলগ্রাউন্ড স্টেটে। এখানে কোথাও কোথাও হিলারি তাঁর অবস্থান শক্তিশালী করতে পেরেছেন। কোথাও ট্রাম্প এগিয়ে আছেন। প্রতিদিনই কয়েকটি মিডিয়া হাউস জনমত জরিপ প্রকাশ করছে। গত ৪ নভেম্বর নিউ ইয়র্ক টাইমস সর্বশেষ জনমত জরিপটি প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায় হিলারি (৪৫ শতাংশ) ৩ পয়েন্টে ট্রাম্পের চেয়ে (৪২) এগিয়ে আছেন। তবে উভয় প্রার্থীর ওপর ক্ষুব্ধ ভোটাররা। ৮২ শতাংশ মানুষ এই দুই প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিতৃষ্ণা প্রকাশ করেছে। তবে ‘ব্যাটেলগ্রাউন্ড স্টেট’ নিউ হ্যাম্পশায়ারে যে জনমত জরিপ হয়, তাতে ট্রাম্প (৪২.২ শতাংশ) হিলারির চেয়ে (৪১.৮) অল্প ব্যবধানে এগিয়ে আছেন। ‘বোস্টন গ্লোব’ পত্রিকা এই জনমত জরিপটি প্রকাশ করে। তবে নিঃসন্দেহে এবারের নির্বাচনের গুরুত্ব অনেক। এ নির্বাচন খোদ অভ্যন্তরীণভাবে যেমন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে, ঠিক তেমনি আন্তর্জাতিকভাবেও এর ফলাফলের ওপর একটি প্রতিক্রিয়া থাকতে পারে। প্রথমত, উভয় প্রার্থীই (হিলারি ও ট্রাম্প) এবার সর্বজন গ্রহণযোগ্যতা পাননি। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যেমন নানা অভিযোগ রয়েছে (যৌন নির্যাতন, মেয়েদের সম্পর্কে অশালীন উক্তি, ট্যাক্স ফাঁকি), ঠিক তেমনি হিলারির বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে (ক্লিনটন ফাউন্ডেশন, ই-মেইল, স্বাস্থ্যঝুঁকি)। নিউ ইয়র্ক টাইমসের সর্বশেষ জনমত জরিপে এ হতাশাই প্রকাশিত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এ ক্ষেত্রে দুজন প্রার্থীর  বক্তব্য বিশ্লেষণ করে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। রাশিয়ার নাম প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ নির্বাচনে এসে গেছে। রাশিয়ার গোয়েন্দারা হিলারি ক্লিনটন তথা ডেমোক্রেটিক পার্টির জাতীয় কমিটির ই-মেইল ফাঁস করেছিল বলে ডেমোক্রেটিক পার্টির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল। একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক ফ্রাংকলিন ফয়ার তথ্য ও উপাত্ত দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন, রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে ট্রাম্পের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির যোগসাজশ রয়েছে (Slate)। অপর এক সাংবাদিক ডেভিড কর্ন লিখেছেন, রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা ট্রাম্পকে বিজয়ী করতে উঠেপড়ে লেগেছে (Mother Jones)। এনবিসি জানিয়েছে, এফবিআই ট্রাম্পের সাবেক ম্যানেজার পল মানাটরসের সম্ভাব্য ‘রাশিয়া ও ইউক্রেন কানেকশন’ নিয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছে। ফলে একটা প্রশ্ন থাকলই রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ভবিষ্যতে কোন পর্যায়ে গিয়ে উন্নীত হবে। বলা ভালো, রাশিয়া কর্তৃক ক্রিমিয়াকে (ইউক্রেন) অন্তর্ভুক্তির পর যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে। হিলারি এটা অব্যাহত রাখতে চান। কিন্তু ট্রাম্প তা চান না। সিরিয়ায় আইএস বন্দিদের উত্খাতে ট্রাম্প সেনা মোতায়েন করতে চান। কিন্তু হিলারি তা চান না। তবে উভয় প্রার্থী ইরাক ও আফগানিস্তানে সীমিতসংখ্যক সেনা সদস্য রাখার পক্ষপাতী। ন্যাটোর প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন ট্রাম্প। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ১৯৪৯ সালে ন্যাটো গঠিত হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল সম্ভাব্য সোভিয়েত আগ্রাসন থেকে ইউরোপকে রক্ষা করা। এখন ট্রাম্প বলছেন, ন্যাটোর ধারণা এখন অচল। তাঁর মতে, ন্যাটোর কার্যক্রম পরিচালনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ইউরোপে মোতায়েনে যুক্তরাষ্ট্র কোনো অর্থ বরাদ্দ করবে না। উল্লেখ্য, ২০১৬-১৭ সালের জন্য ন্যাটোর সামরিক বাজেট ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ইউরো। আর সিভিল বাজেট ২২২ মিলিয়ন ইউরো। এই অর্থের ২২ শতাংশ দেয় যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি দেয় ১৪ শতাংশ, ফ্রান্স ১০ শতাংশ। ২৮ সদস্যভুক্ত প্রতিটি দেশকেই অর্থের একটা অংশ দিতে হয়। আইএস দমনে সেনা মোতায়েনের পক্ষে ট্রাম্প বললেও কাজটি খুব সহজ হবে না। মোট পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থ ব্যয় করেও আফগানিস্তান কিংবা ইরাকে কোনো স্থিতিশীলতা ফিরে আসেনি। এখন যদি সিরিয়ায় মার্কিন মেরিন সেনা পাঠানো হয়, তাহলে এই যুদ্ধ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে যাবে। হিলারি ক্লিনটন মেরিন সেনা পাঠানোর বিপক্ষে। ইরানের সঙ্গে যে পারমাণবিক চুক্তি হয়েছে, হিলারি তা মেনে চলবেন। কিন্তু ট্রাম্প তা মানবেন না। তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে ইরানের সঙ্গে যে পারমাণবিক সমঝোতা চুক্তি হয়েছে, তা বাতিল করলে জটিলতা আরো বাড়বে। সিরিয়া সংকটকে তা আরো গভীরতর করবে এবং এ অঞ্চলে রাশিয়া-ইরান-চীন আরো শক্তিশালী হবে। এটা ট্রাম্পের জন্য কোনো বাস্তববাদী নীতি হতে পারে না। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ব্যাপারে ট্রাম্পের কোনো কমিটমেন্ট নেই। তবে হিলারি চান ফিলিস্তিনিদের আলাদা রাষ্ট্র হোক। একসময় হিলারি যখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন তখন তিনি টিপিপি (ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ, ১২টি দেশের মাধ্যে শুল্কমুক্ত পণ্য সুবিধা) চুক্তি সমর্থন করেছিলেন। এখন অবশ্য হিলারি (একই সঙ্গে ট্রাম্পও) বলছেন, তিনি টিপিপি চুক্তি সমর্থন করবেন না। এরই মধ্যে অনেক দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র টিপিপি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের সমর্থনের প্রয়োজন আছে। ট্রাম্পের অভিযোগ, টিপিপি চুক্তি কার্যকরী হলে যুক্তরাষ্ট্রে বেকার সমস্যা বেড়ে যাবে। ছোট ছোট  কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, চিলি কিংবা পেরু থেকে (যাদের সঙ্গে টিপিপি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে) সস্তায় পণ্য আসবে। এখানে অনেক প্রশ্ন আছে। যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এখন নয়া প্রশাসন চুক্তি বাতিল করলে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে থাকবে। উপরন্তু চারটি দেশ (ব্রুনাই, চিলি, নিউজিল্যান্ড ও সিঙ্গাপুর) চুক্তির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তাহলে চুক্তির ভবিষ্যৎ কী? ট্রাম্প মেক্সিকোর পণ্যের ওপর ৩৫ শতাংশ হারে কর আরোপ করতে চান। তাহলে নাফটা চুক্তির কী হবে? নাফটা চুক্তি তো তাহলে অকার্যকর হয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ সস্তায় পণ্য পেতে অভ্যস্ত। অতিরিক্ত কর আরোপ করলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তা প্রভাব ফেলবে।

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক কী হবে, এটাও স্পষ্ট করেননি হিলারি ও ট্রাম্প। ট্রাম্প বলেছেন, তিনি চীনা পণ্যের ওপর ৪৫ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপ করবেন। এটা আদৌ সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। হিলারি চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেন। তবে সমস্যা আছে দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে। স্ট্র্যাটেজিক কারণে দক্ষিণ চীন সাগর যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটা তার সাপ্লাই লাইন। উপরন্তু এখানে রয়েছে প্রচুর জ্বালানি সম্পদ (তেল ও গ্যাস)। মার্কিন তেল কম্পানিগুলোর বেশ আগ্রহ রয়েছে এ অঞ্চলের ব্যাপারে। চীনেরও আগ্রহ রয়েছে। অতি সম্প্রতি এ অঞ্চলের সমুদ্রসীমার অধিকারের ব্যাপারে ফিলিপাইনের দাবিকে সমর্থন করেছেন আন্তর্জাতিক আদালত। চীনের দাবিকে সমর্থন করেননি। তবে চীনের একটা প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে চীন ফিলিপাইনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করেছে। ফিলিপাইনের নয়া প্রেসিডেন্ট সম্প্রতি চীনে গিয়েছিলেন। তাঁর যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী ভূমিকা একটা বড় প্রশ্ন রাখল—এ অঞ্চলের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ভবিষ্যতে কী হবে? যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এ অঞ্চল ঘিরেই ওবামা তাঁর Pivot to Asia পলিসি গ্রহণ করেছিলেন। এখন একজন নয়া প্রেসিডেন্ট কিভাবে বিষয়টি দেখবেন, সেটাই দেখার বিষয়। ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে। ব্যবসায়িক স্বার্থের পাশাপাশি ভারতের স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব অনেক। ভবিষ্যতে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে—এমন কথাও বলছেন কোনো কোনো বিশ্লেষক। চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ কর্মসূচিও যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। চীন ৬০টি দেশকে এই ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ কর্মসূচির আওতায় আনছে, যার মাঝে মধ্য এশিয়ার জ্বালানি সম্পদ সমৃদ্ধ দেশগুলোও আছে। এটা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে। এ ক্ষেত্রে হিলারি কিংবা ট্রাম্প কেউই পেন্টাগনের স্বার্থের বাইরে যেতে পারবেন না। মেক্সিকোর সঙ্গে সীমান্তে উঁচু দেয়াল নির্মাণ করতে চান ট্রাম্প। কিন্তু মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট জানিয়ে দিয়েছেন এর খরচ তিনি বহন করবেন না। অবৈধ মেক্সিকানদের বিরুদ্ধে তিনি গুপ্তহত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ এনেছিলেন। তিনি এদের স্বদেশে ফেরত পাঠাতে চান। কিন্তু হিলারি তা চান না। মুসলিমবিদ্বেষী মনোভাব থেকে ট্রাম্প খুব একটা সরে আসেননি। কিন্তু হিলারির অবস্থান এর উল্টো। তিনি মনে করেন না মুসলমানরা সবাই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। সিরীয় শরণার্থীদের নিষিদ্ধ ও ব্যাপক স্ক্রিনিংয়ের পক্ষপাতী ট্রাম্প। হিলারি এ ক্ষেত্রে নমনীয়। তবে সামাজিক ক্ষেত্রে ট্রাম্প ও হিলারির মধ্যে কিছু কিছু পার্থক্য লক্ষ করা যায়। উঁচুস্তরের ধনীদের হিলারি আরো ব্যাপক ট্যাক্সের আওতায় আনতে চান, ট্রাম্প তা চান না; যদিও দুজনই প্রস্তাব করেছেন, তাঁরা আরো ট্যাক্স কমাবেন। ট্রাম্প করপোরেট ট্যাক্স কমানোর কথা বললেও হিলারি তাতে রাজি নন। হিলারি ন্যূনতম বেতন বাড়ানোর পক্ষপাতী। ট্রাম্প বেতন বাড়াবেন না। স্বাস্থ্যসেবায় কোনো পরিবর্তন আনবেন না হিলারি। আর ট্রাম্প বলছেন, তিনি মেডিকেয়ার আর মেডিকেইড বাতিল করবেন, যা হিলারি সমর্থন করেননি।

যুক্তরাষ্ট্রের এ নির্বাচনের ব্যাপারে বাংলাদেশিদেরও যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের স্বার্থ রয়েছে। আমরা জিএসপি সুবিধা এখনো ফিরে পাইনি। হিলারি কিংবা ট্রাম্প যে কেউ একজন প্রেসিডেন্ট হলে আমরা জিএসপি ফিরে পাব তার কোনো গ্যারান্টি নেই। তৈরি পোশাকের শুল্কমুক্ত সুবিধা আমাদের জন্য অন্যতম অগ্রাধিকার। দক্ষিণ এশিয়া তথা বাংলাদেশে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের উত্থান রোধে মার্কিন সহযোগিতা আমাদের প্রয়োজন। সেই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করা, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কিংবা নবায়নকৃত জ্বালানি ক্ষেত্রে সাহায্য ও সহযোগিতা আমাদের দরকার। কেরির ঢাকা সফরের সময় এ-সংক্রান্ত একটি চুক্তিও হয়েছিল। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে হিলারি বাংলাদেশে এসেছিলেন ২০১২ সালে। তখন বাংলাদেশকে আখ্যায়িত করেছিলেন একটি ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবে। তবে বাংলাদেশ সম্পর্কে ট্রাম্পের কোনো মন্তব্য আমার চোখে ধরা পড়েনি। একটি বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে আজ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ২৭০টি নির্বাচকমণ্ডলীর ভোটের ম্যাজিক ফিগারের দিকে দৃষ্টি এখন অনেকের। ৫৩৮টি নির্বাচকমণ্ডলীর ভোটের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের নির্ধারিত ভোট ২০০টি। অর্থাৎ ক্যালিফোর্নিয়াসহ (৫৫ ভোট) মোট ১৭টি স্টেটের নির্বাচকমণ্ডলীর সব ভোট তাঁদের পক্ষে। আরো পাঁচটি স্টেটের ৬৮টি ভোট তাঁদের দিকে ঝুঁকে আছে। অন্যদিকে টেক্সাসসহ (৩৮) ২০টি স্টেটের ১৫৭টি নির্বাচকমণ্ডলীর ভোট রিপাবলিকান শিবিরে অর্থাৎ ট্রাম্পের পক্ষে। ঝুঁকে আছে আরো পাঁচটি স্টেটের ৪৭টি ভোট। এর বাইরে কয়েকটি ব্যাটেলগ্রাউন্ড স্টেটের (৬) ৬৬টি নির্বাচকমণ্ডলীর ভোটই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাই শেষ মুহৃর্ত পর্যন্ত স্পষ্ট করে বলা যাচ্ছে না কে শেষ হাসি হাসবেন।

নিউ ইয়র্ক থেকে

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

tsrahmanbd@yahoo.com

Add Comment

Click here to post a comment