মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

কেমন প্রেসিডেন্ট পাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-আবদুল মান্নান

আবদুল মান্নানএই লেখা যখন পাঠকদের হাতে পৌঁছবে তখন যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররা ৪৫তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করে ফেলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২২৮ বছর আগে ১৭৮৮ সালে। সেবার সীমিতসংখ্যক ভোটার দেশটির প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে জর্জ ওয়াশিংটনকে নির্বাচিত করেছিলেন। তাঁর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না, ছিল না কোনো দল। এই নির্বাচনের সঙ্গে জড়িত ছিল সদ্যঃস্বাধীন দেশটির ১০টি রাজ্য, আর ভোটারের সংখ্যা ছিল ২৯ হাজারের নিচে। নারী আর ক্রীতদাসদের কোনো ভোটাধিকার ছিল না। বর্তমানে ১৮ বছর বয়স হলে যে কেউ ভোট দিতে পারে। তবে তাদের ভোট দেওয়ার জন্য তালিকাভুক্ত হতে হবে। এবারের নির্বাচনে প্রায় ২০ কোটি মার্কিন নাগরিক ভোটার হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে পারত। শেষ হিসাবে হয়েছে ১৪ কোটি ৪৬ লাখ। বাংলাদেশ আর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সময়ের ব্যবধান ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা। সেই হিসাবে পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো থেকে এতক্ষণে ফলাফল আসতে শুরু করেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, যুক্তরাষ্ট্রের এবারের নির্বাচন যেভাবে সারা বিশ্বে আলোচিত হয়েছে, তেমনটি এর আগে আর কখনো দেখা যায়নি। এর প্রধান কারণ হচ্ছে নির্বাচনে যে দুজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন তাঁদের মতো এত নিন্দিত ও বিতর্কিত প্রার্থী যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে দেখা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম শ্রেণির দৈনিক পত্রিকা বোস্টন গ্লোব সপ্তাহ কয়েক আগে এক মন্তব্য প্রতিবেদনে লিখেছে, ‘৩২ কোটি মানুষের দেশে কেমন করে আমরা এই পরিস্থিতির সম্মুখীন হলাম যে আমাদের ট্রাম্প আর হিলারির মতো দুজন জঘন্য প্রার্থীর মধ্য থেকে আমাদের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট বাছাই করতে হচ্ছে?’ বাংলাদেশের রাজনীতি, গণতন্ত্র, নির্বাচন ইত্যাদি নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব প্রায়ই ঠাট্টা-তামাশা করে। কারণে-অকারণে যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা ছুটে আসেন আমাদের গণতন্ত্রের সবক দিতে। কয়েক দিন পর পর ব্রিটেনের নামকরা সাময়িকী ইকোনমিস্ট বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে লিখতে গিয়ে শেখ হাসিনা ও বেগম জিয়া সম্পর্কে মন্তব্য করে, ‘Battling Begums’ (ঝগড়ারত বেগমরা)। কিন্তু এবারের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের শুরু থেকে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প আর ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন যে ভাষায় পরস্পরকে আক্রমণ করেছেন, তা ঝগড়া নয়, গণতন্ত্রের কোনো রীতিনীতির মধ্যে পড়ে না। কোনো কোনো সময় ট্রাম্পের বক্তব্য শ্রবণযোগ্য ছিল না।

বাংলাদেশ বা অন্য অনেক দেশের মতো যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মঞ্চে কোনো নির্বাচনের আগে, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে কোনো দলেরই কোনো মুখ্য প্রার্থী তেমন একটা দৃষ্টিগোচর হয় না। যুক্তরাষ্ট্রে আরো কয়েকটি রাজনৈতিক দল থাকলেও প্রায় সব নির্বাচনই ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। নির্বাচনের বছরখানেক আগে যে কেউ খায়েশ প্রকাশ করতে পারেন, তিনি সামনের বার অমুক দল থেকে পরবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হবেন। সেই মতে তাঁরা তাঁদের দলীয় সমর্থকদের মধ্যে প্রচার-প্রচারণা চালাতে পারেন। দল কাকে মনোনয়ন দেবে তা নির্ভর করে দলের কাউন্সিলরদের ওপর। বাছাই পর্বে যোগ্যতার চেয়ে অর্থ একটা বড় ভূমিকা পালন করে। এই নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের কোনো ভালো প্রার্থী ছিল না। শেষমেশ রিপাবলিকান দলের মনোনয়ন পান ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও টেলিভিশনের রিয়ালিটি শোর জন্য খ্যাত ডোনাল্ড ট্রাম্প। রাজনীতির মাঠে ট্রাম্পকে একজন আগন্তুক মনে করা হয়। অন্যদিকে ডেমোক্রেটিক দলের মনোনয়ন পান সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের স্ত্রী ও ফার্স্ট লেডি হিলারি ক্লিনটন। তিনি নিউ ইয়র্ক থেকে সিনেটর এবং বারাক ওবামার প্রথম মেয়াদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। পেশায় তিনি একজন আইনজীবী এবং সাংঘাতিক ধূর্ত বলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে যে হানাহানি চলছে, তার জন্য আরো অনেকের সঙ্গে হিলারিকেও দায়ী করা হয়। তাঁর প্ররোচনায় বারাক ওবামা লিবিয়া দখল করে কর্নেল গাদ্দাফিকে হত্যা করেন। আইএসের উত্থান ও অর্থায়নের জন্য হিলারির নিন্দিত ভূমিকা বর্তমানে সর্বজনবিদিত। তিনি নিজ দেশে শান্তি প্রত্যাশা করলেও অন্য দেশে অশান্তি সৃষ্টি করতে কসুর করেন না। বাংলাদেশের পদ্মা সেতু থেকে বিশ্বব্যাংকের সরে যাওয়ার পেছনে তাঁর ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ আছে। এটি তিনি অন্য কারো প্ররোচনায় করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। সবার ধারণা, হিলারি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে বিশ্ব আরো অশান্ত হয়ে ওঠার আশঙ্কা অনেক বেশি।

একসময় ট্রাম্প টিভি রিয়ালিটি শোতে অংশ নিয়ে খ্যাতি অর্জন করলেও মাঝেমধ্যে পেশাদার কুস্তি প্রতিযোগিতার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। নানা রকমের ব্যবসা করেছেন লোকসান দিয়ে। ট্রাম্প ভুয়া বিশ্ববিদ্যালয় খুলে ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। মোটা অঙ্কের ট্যাক্স ফাঁকি দিয়েছেন। তাঁর বর্তমান স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্প একজন মডেল। প্রাপ্তবয়স্কদের ম্যাগাজিনে নগ্ন হয়ে পোজ দিতে দ্বিধা করেন না। ট্রাম্পের মতে, শরীর সুন্দর থাকলে তা প্রদর্শনে বাধা কোথায়? ট্রাম্পের নারীঘটিত কেলেঙ্কারি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের মুখে মুখে। তাঁর এসব কর্মে সে দেশের এক শ্রেণির নারী বেশ পুলক অনুভব করেন। ট্রাম্পের দাদা ফ্রেডরিখ ট্রাম্প জার্মানি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন। পেশায় ছিলেন পতিতার দালাল। কানাডায় তিনি একটি পতিতালয় চালাতেন। ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ায় তাঁর জুড়ি ছিল না। ট্রাম্পের বাবা ফ্রেড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের চরম বর্ণবাদী গোষ্ঠী ক্লু ক্লাক্স ক্ল্যান (KKK)-এর সদস্য ছিলেন। জায়গাজমির ব্যবসা করতেন। ট্রাম্প নিজেও একজন বর্ণবাদী। কেকেকে (KKK) তাঁকে এর মধ্যেই সমর্থন দিয়েছে। তিনি ঘোষণা করেছেন, নির্বাচনে জিতলে মেক্সিকো থেকে অভিবাসী আসা ঠেকানোর জন্য সীমান্তে দেয়াল তুলবেন। প্রয়োজনে মেক্সিকোতে অভিযানও চালাতে পারেন। ঘোষণা করেছেন, মুসলমানরা জাতীয় দুশমন। নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তাঁর দেশের সব মসজিদ বন্ধ করে মুসলমানদের দেশ থেকে বহিষ্কার করে দিতে পারেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর প্রথম কাজ হবে হিলারিকে জেলে পাঠানো, তেমন ঘোষণা তিনি এর মধ্যেই দিয়ে রেখেছেন। জয়ের ব্যাপারে তিনি শতভাগ আশাবাদী। বলেছেন, না জিতলে তিনি নির্বাচন মেনে নেবেন না। মজার ব্যাপার হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো জীবিত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সমর্থন দেননি।

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন পদ্ধতি বেশ জটিল। নির্বাচনের দিন কোনো ছুটি থাকে না। তাই অনেক সময় ৫০ শতাংশ মানুষও ভোট দিতে যায় না। কোনো একজন প্রার্থী বেশি ভোট পেলেও তিনি পরাজিত হতে পারেন। আল গোরের চেয়ে কম ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন জর্জ বুশ। একজন প্রার্থী বিজয়ী হন ইলেকটোরাল কলেজ ভোটের হিসাবে। জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রতিটি রাজ্যের জন্য ইলেকটোরাল কলেজ ভোটের সংখ্যা আগে থেকেই নির্ধারিত আছে। যেমন—ক্যালিফোর্নিয়ায় এই সংখ্যা ৫৫। এই রাজ্যে একজন প্রার্থী বেশি ভোট পাওয়ার অর্থ ৫৫টি ইলেকটোরাল ভোট সেই প্রার্থী পাবেন। টেক্সাসে ৩৪টি। এমন রাজ্যগুলো যেকোনো প্রার্থীর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মোট ইলেকটোরাল ভোট ৫৩৮টি। জিততে হলে পেতে হবে ২৭০টি। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে কারচুপি নতুন কোনো ঘটনা নয় এবং ধরনও নানা রকমের হতে পারে। রিপাবলিকানরা চায়, কালোরা ভোট দিতে না যাক। তার জন্য নির্বাচনকেন্দ্রের পথে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। ২০০০ সালের নির্বাচনে বুশের ভাই জেব বুশ ফ্লোরিডার গভর্নর ছিলেন। ভোটগণনার মাঝপথে গণনা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তা বন্ধ ছিল তিন দিন। ঘোষণা করেছিলেন, গণনার যন্ত্র নষ্ট। উচ্চ আদালত ঘোষণা করেছিলেন, এই রাজ্যের ভোটগণনা ছাড়াই ফলাফল ঘোষণা করা হোক। তা-ই হয়েছিল। পরে ভোটগণনার পর দেখা গেল, সেই রাজ্যে গোর জিতেছিলেন। ফলাফল আগে জানা গেলে গোর প্রেসিডেন্ট হতেন। নির্বাচনে আগাম ভোট দেওয়া যায়। এই নির্বাচনের আগে চার কোটির বেশি আগাম ভোট পড়েছে। এরই মধ্যে ট্রাম্প গণনায় কারচুপির অভিযোগ এনেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে জনমত গঠনে একসময় মিডিয়ার একটি বড় ভূমিকা ছিল। এবার তেমন একটা নেই; কারণ নানা কারণে সেই দেশের মানুষ আর তাদের মিডিয়াকে তেমন একটা বিশ্বাস করে না। তার পরও বিভিন্ন মিডিয়া প্রতিনিয়ত নানা মতামত জরিপ করে যাচ্ছে। কখনো হিলারিকে এগিয়ে রাখছে তো কখনো ট্রাম্পকে। ফাইভ থার্টিএইট নামের একটি জরিপ সংস্থা নির্বাচনের ২৪ ঘণ্টা আগে জানিয়েছে, ৬৭ শতাংশ মানুষ মনে করে এবার হিলারি যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন। তা-ই যদি হয়, তাহলে বিশ্বশান্তির জন্য তা একটি অশনিসংকেত হতে পারে। আর ট্রাম্প জিতলে দেশের ভেতর চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আগাম সংকেত আছে। এরই মধ্যে ট্রাম্প সমর্থকরা কালোদের গির্জায় আগুন দেওয়া শুরু করেছে। বেশ কিছু মিডিয়া জানিয়েছে, নির্বাচনের দিন জেফারসন-লিংকনের দেশে ব্যাপক সহিংসতা হতে পারে। উইকিলিকস খ্যাত জুলিয়াস অ্যাসাঞ্জ যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, এবারের নির্বাচন কলেরা আর গনোরিয়া, দুটির একটিকে পছন্দ করে নেওয়া। আর কয়েক ঘণ্টা পর নির্বাচনের ফল জানা যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের দেশের মানুষ কলেরাকে বেছে নিল, না গনোরিয়ার পক্ষে রায় দিল তা পরিষ্কার হয়ে উঠবে। পছন্দ যা-ই হোক, সম্ভবত বিশ্বকে নতুন আরেক অশান্ত পরিবেশের মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এবারের নির্বাচন সম্ভবত সবচেয়ে কদর্য রূপ ধারণ করেছে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রকে গণতন্ত্রের সবক দেওয়া বন্ধ করতে হবে।

লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক

Add Comment

Click here to post a comment