slider আন্তর্জাতিক

কলঙ্কজনক একটি অধ্যায়ের ইতি

‘আমি সেই শাসক যে তোমাদের সভাপতিত্ব করবে… যদি তোমরা মনে কর আমি ঠিক পথে আছি, আমাকে সহযোগিতা কর’। মসুলের গ্রান্ড আল নূরি মসজিদে এই কথাগুলো বলছিলেন ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক এন্ড দ্য লেভান্ত (আইএস)-এর নেতা আবু বকর আল বাগদাদি। এসময় তিনি একটি নতুন খিলাফত এবং নিজেকে মুসলিম জাহানের খলিফা হিসেবে ঘোষণা করেন। সুন্নি অধ্যুষিত মসুলের অবহেলিত সুন্নিদের আংশিক অবশ্য তাদের ক্ষমতায় আরোহণকে স্বাগতও জানায়। তারপর টাইগ্রিস আর ইউফ্রেটিসের জল গড়িয়ে চলে আরো তিন বছর। এর মধ্যে আইএসের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়া থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে তরুণ-তরুণীরা তাদের দলে যোগ দেয়। এই সময়ে আইএসের নিষ্ঠুরতার ইতিহাস সবারই জানা। তারা বিশ্বজুড়ে নির্বিচারে জঙ্গি হামলা, ইয়াজিদি নারীদের ধর্ষণ, গণহত্যা চালিয়ে যেতে থাকে। এর আগে জঙ্গি সংগঠনটি ইরাক ও সিরিয়ায় সরকারি বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করে উভয় দেশের বহু শহর ও এলাকা খিলাফতের অন্তর্ভুক্ত করে দেশ দু’টির মধ্যবর্তী রাষ্ট্রীয় সীমান্ত তুলে দেয়। তারা সিরিয়ার রাকা শহরকে তাদের রাজধানী ঘোষণা করে এবং ইরাকের মসুলকে ব্যবহার করে দ্বিতীয় রাজধানী হিসেবে। এখান থেকেই পুরো ইরাকে তাদের অধিকৃত অংশে শাসনকাজ পরিচালনা করা হতো। মসুল শহরের পশ্চিমাংশে অবস্থিত আল নূরি মসজিদ কম্পাউন্ড ছিল তাদের প্রধান ঘাঁটি।

১৭ অক্টোবর, ২০১৬। ১৮ হাজার ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনী, ১০ হাজার কুর্দি, পুলিশ, সুন্নি ও শিয়া মিলিশিয়া যোদ্ধা এবং পাশাপাশি আমেরিকার উপদেষ্টামন্ডলীদের সমাবেশ। এবং শুরু হলো ‘ইসলামিক স্টেট’ থেকে মসুল পুনরুদ্ধারের দীর্ঘ কাঙ্ক্ষিত অভিযান। সে সময় ইরাকি প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল-আবাদি টেলিভিশনে ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘আল্লাহ চায় তো মসুলের মাটিতে শিগগিরই আমাদের দেখা হবে। সেখানে আমরা স্বাধীনতা ও মুক্তির স্বাদ উদযাপন করব। আবাদির সেই কথা যেন সত্য প্রমাণিত হলো। ২৯ জুন, ২০১৪ সালে সাড়ে আটশ’ বছরের পুরনো যে মসজিদ থেকে বাগদাদি খিলাফত ঘোষণা করে, ঠিক আট মাস পর সেই মসজিদ ধ্বংস করে দিয়ে আইএসের পতনের সমাধি ঘোষণা করলেন ইরাকি প্রধানমন্ত্রী। এরফলে মধ্যপ্রাচ্যে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে। সেইসাথে ইরাকের অর্ধেক অংশ এবং শুধু তাই নয়, সিরিয়ার রাকারও ২০ শতাংশ সরকারি বাহিনীর অধিভুক্ত হয়ে যায়। স্পষ্ট যে, ইরাকে ইসলামিক স্টেটের দখল সুরক্ষার লড়াইয়ে সরকারি বাহিনীর এটা প্রতীকী বিজয়। তবে এ পর্যায়ে আইএসের পরাজয় অতিশয় আসন্ন।

প্রথমত. মসুলের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হওয়ার সাথে সাথেই আইএস’র রাজস্ব আয় পুরোদস্তুর বন্ধ হয়ে যাবে। কেননা তারা তেলক্ষেত্রগুলোর নিয়ন্ত্রণ হারাবে; ফলে কালোবাজারে তেল বিক্রি করতে পারবে না। তাছাড়া শহরের সাড়ে সাত লাখ অধিবাসীর কাছ থেকে অর্জিত খাজনা আদায়, ধনীদের টাকা-পয়সা, সোনা-দানা ও অন্যান্য সম্পত্তি জব্দ করার সুযোগ তারা হারিয়ে ফেলবে। অবশ্য আইএসের আয়-রোজগার কমার প্রক্রিয়া বেশ আগেই আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল। আইএসএইচ মারকিট নামের লন্ডনভিত্তিক এক প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষকরা হিসাব দিয়েছেন, ২০১৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে তাদের মাসিক আয় ছিল আট কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার; ২০১৭ সালে এসে তা কমে দাঁড়িয়েছে এক কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলারে। অর্থাত্ গত দু’বছরে ৮৮ শতাংশ রাজস্ব আয় কমেছে তাদের। এসময়ে তাদের অধিকৃত ভূখণ্ড ৯০ হাজার আটশ’ বর্গ কি.মি. থেকে ৬০ শতাংশ কমে ৩৬ হাজার দু’শ’ বর্গ কি.মিতে পৌঁছেছে।

দ্বিতীয়ত. যে নূরি মসজিদকে জঙ্গিরা সদর দপ্তর বানিয়েছিল সেটি থেকে তাদের বিদায় মানে একটি বড় পরাজয়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যেসব তরুণ-তরুণী এর প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করছিল এই পরাজয় তাদের মনস্তত্ত্বে এক কুঠারাঘাত। ইসরাইলের ইন্টারডিসিপ্লিনারি সেন্টারের সন্ত্রাসবিরোধী ইনস্টিটিউটের এক জ্যেষ্ঠ গবেষক এলি কারমন বলেন, আমি মনে করি, আইসিস পরিষ্কারভাবে পরাভূত হয়েছে; এই পরাজয় শুধু সামরিকভাবে নয় উপরন্তু মানসিক ও প্রচারণামূলকভাবেও হয়েছে। আইএস পতনের ঘটনায় বিশ্বজুড়ে স্বস্তি আসলেও বার বার দুটি প্রশ্ন ঘুরপাক খেয়েই যাচ্ছে। সত্যিই কী আইএস নামক সন্ত্রাসী দানবের তিরোধান হয়েছে? ইরাক, সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যে আসবে কী স্থিতিশীলতা?

ইরাকি সেনার মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া রসুল সংবাদ মাধ্যমের কাছে জানিয়েছেন, ইরাকে আইএস জঙ্গিদের যে আধিপত্য, তা ধ্বংস করা হলো। তবে দেশটি থেকে তাদেরকে পুরোপুরি ধ্বংস করার কাজ যে এখনো কঠিন তা মানছে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটশক্তি। এজন্য কানাডা দেশটিতে তাদের সামরিক বাহিনীর মেয়াদ আরো দুই বছর বাড়িয়েছে।

এখনো সম্পূর্ণ মসুল শহর যৌথ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বেলজিয়ামের মতো দেশের আকারে এখনো একটি অংশ জঙ্গিদের দখলে রয়েছে গেছে। শহরের পূর্ব ও পশ্চিম অংশ, হুয়ায়জা ও তেল আফর এবং ইউফ্রেটিসের তীরবর্তী সীমান্ত এলাকা জিহাদিদের দখলে রয়েছে। এই মুক্ত এলাকায় গুপ্ত দল (স্লিপার সেল) ইতোমধ্যেই সজাগ প্রস্তুত রয়েছে। তাছাড়া এখনো মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় তিনশ যোদ্ধা ও শহরের পশ্চিমাংশে শতাধিক যোদ্ধা তীব্র লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

কুর্দি গোয়েন্দা কর্মকর্তা লাহুর তালাবানি বলেন, জঙ্গিদের শক্ত ঘাঁটি মসুল থেকে যদি তাদের হটিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে মরুভূমি এবং পাহাড়ি এলাকাগুলোয় আশ্রয় নিয়ে সেখান থেকে তারা তাদের যুদ্ধের নতুন কৌশল অবলম্বন করবেন। যেখানে কোনো নিরাপত্তা বাহিনী পৌঁছুতে পারে না, উল্টো সেখান থেকে সহজে লুকানো ও প্রদেশ থেকে প্রদেশে হামলা পরিচালনা করা যায়।

এছাড়া এখন যখন ইরাক-সিরিয়া থেকে আইএস যোদ্ধারা পালাতে শুরু করেছে, তাতে সারা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের জন্য বিপদ আরো বেড়ে গেছে। এইসব তরুণ-যুবারা স্বদেশে ফিরে গেছে বা যাওয়ার চেষ্টা করছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিবে তারা। ফলে আফগানিস্তান থেকে চলে আসা জঙ্গিদের চেয়ে আরো বেশি চৌকশ ও দক্ষ আইএসরা যে কী ভবিষ্যত্ সন্ত্রাস নিয়ে অপেক্ষা করছে তা আসলে ধারণার বাইরেই মনে করেন বিশ্লেষকরা।

এদিকে আইএস পতনে সিরিয়া ও ইরাক যখন উত্সব উদযাপনে প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন ইসরাইলের সন্ত্রাসবিরোধী ইনস্টিটিউটের ঐ জ্যেষ্ঠ গবেষক শোনালেন অন্য কথা। এ বিশেষজ্ঞ বলেন, দেশগুলোতে স্থিতিশীলতার আনয়নের বিষয়টি হয়তো মাসের পর মাস বা বছরের পর বছর অধরাই থেকে যেতে পারে। তিনি মনে করেন, আইসিসের পতন মানেই এ অঞ্চলের সমস্যা সমাধানের কৌশলগত শেষ নয়। তার মতে, ইরান সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়ারা যেহেতু মসুলের উত্তরাংশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় চেষ্টা চালাচ্ছে, তাই সম্ভাব্য ‘পাল্টা প্রতিশোধের হামলায়’ সুন্নি মুসলিমরা উদ্বিগ্ন রয়েছেন। অন্যদিকে কুর্দি ইরাকিরা তাদের সাম্প্রতিক সামরিক সাফল্যকে ব্যবহার করে ২৫ সেপ্টেম্বর আসন্ন গণভোটে স্বাধীন হওয়ার জোর প্রচেষ্টা চালাবে।

এছাড়া দেশটিতে জাতিগত দ্বন্দ্ব নিরসনে রাজনৈতিক নেতারা যদি আবারো ব্যর্থ হন, তাহলে সুন্নি মুসলিম ইসলামিক স্টেটের মতো অন্য একটি জঙ্গিগোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন বিশেষজ্ঞরা। তাছাড়া ২০১০-১১ সালে মসুলে বেকারত্ব ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। ফলে এসব তরুণ আইসিসের মতো একটি চরমপন্থী অভ্যুত্থানের জন্য অপেক্ষা করছিল। তাই এবারো তারা যদি একই সমস্যায় পড়ে আইএসে যোগ দেয় তাহলে আর কিছুই করার থাকবে না।

এদিকে ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকার শিয়াপন্থী হলেও মসুল চলে স্থানীয় সংগঠন সুন্নি আরবের কমান্ডার জেনারেল নাজিম আল-জাবোরির তত্ত্বাবধানে; যিনি স্থানীয় জনগণের কাছে জনপ্রিয় ও সম্মানজনক অবস্থানে রয়েছেন। তাই ২০১৪ সাল থেকেই শহরটি কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশনা এবং নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর বাইরে রয়েছে বলা চলে। ওদিকে আইএসের মাফিয়া কাজকর্মের খবর আগেই জানা আছে সকলের। তারা বড় বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণকারী যেমন, রিয়েলস্টেট কোম্পানি, মোবাইল ফোন বা স্বর্ণের কারবারিদের হত্যা ও ভয় দেখিয়ে বিপুল পরিমাণে অর্থ সংগ্রহ করত। তাই সেই গুপ্ত প্রক্রিয়া তারা অব্যাহত রেখে দেশে অস্থিরতা বজায় রাখবে তার আশঙ্কা করাই যায়।

এত আতঙ্কের বেড়াজালে আরেকটি আশঙ্কায় সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়েছে। দায়েশ বিতাড়িত হওয়ার পথে থাকলেও আমেরিকা ইরাকে তাদের সেনা মোতায়েন রাখার পাঁয়তারা করছে। এ ব্যাপারে ইরাকিদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। দায়েশ সন্ত্রাসীদের কবল থেকে মসুল উদ্ধার পরবর্তী ইরাকের ভবিষ্যত্ নিয়ে লেবাননের খ্যাতনামা রাজনৈতিক বিশ্লেষক নাসের কানদিল দৈনিক আল আম্বিয়াকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে বলেছেন, দায়েশের পতনের পর ইরাক ও সিরিয়ায় মার্কিন সেনা উপস্থিতির পক্ষে আমেরিকার আর কোনো ব্যাখ্যা থাকতে পারে না। তাই ঐ অঞ্চলে সেনা রাখার মার্কিনীদের অভিপ্রায় কী নতুন বোতলে পুরনো মদ রাখার মতো নব সংস্করণ আইএসের জন্ম দিবে কী?

Advertisements