মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

কর্মী, দল ও দেশবান্ধব নেতা জাহাঙ্গীর আলম

%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%97%e0%a7%80%e0%a6%b0-%e0%a6%86%e0%a6%b2%e0%a6%aeগত কিছুদিন ধরে ‘কর্মীবান্ধব’ শব্দের প্রচার ও প্রসার নিয়ে নানা মহলে বেশ কথাবার্তা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, যে নেতা কর্মীবান্ধব, যিনি কর্মীদের সুখে দুঃখে নিজেকে সঁপে দেন, তিনি দলের আদর্শ নেতা। কর্মীদের এমন নেতাই চাই। গণমাধ্যমেও রাজনৈতিক নেতার বড় গুণ হিসেবে কর্মীবান্ধব শব্দের ব্যবহার হচ্ছে। সব মুশকিল আসানের জন্য কর্মীবান্ধব নেতাই কর্মীদের ভরসাস্থল।

গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেতার গুণ-কীর্তন প্রচার করা নেতার জন্য খুবই গুরুত্ব্বপূর্ণ। প্রকৃত অর্থে এটা যতই হোক তার গুণ বা বেগুন। কারণ, প্রচারেই প্রসার। কে কী মনে করল তাতে নেতার কিছু যায় আসে না। প্রচারের লোভ বর্তমানে এই অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে যেমন আছে, তেমনি গণমাধ্যমের যখন সৃষ্টি হয়নি, তখনো তা ছিল। সে সময় আন্তঃব্যক্তি যোগাযোগের মাধ্যমে প্রভাবশালীরা নিজেদের প্রচার চালাতেন।

এ প্রসঙ্গে গোপাল ভাঁড়ের একটি গল্পের অবতারণা করা যায়। প্রায় শ’তিনেক বছর আগে বাংলার কৃষ্ণনগরের তৎকালীন মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের প্রিয়পাত্র ছিলেন গোপাল নামে প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত এক যুবক। তিনি গোপাল ভাঁড় নামেই সমধিক পরিচিত। গোপাল যেহেতু রাজার প্রিয়পাত্র ছিলেন তাই একবার সবাই মিলে তাকে গ্রামের মোড়ল বানাল। একদিন ভোরবেলায় গ্রামের এক লোক এসে ‘গোপাল বাবু, গোপাল বাবু’ বলে ডাকতে লাগল। গোপাল ঘরে সজাগ থাকলেও সে কোনো জবাব দিচ্ছিল না। লোকটি আবার ‘মোড়ল মশাই, মোড়ল মশাই’ বলে ডাকতে লাগল। তবুও গোপাল জবাব দিচ্ছে না। বিরক্ত হয়ে গোপালের বউ বলল, তুমি জেগে ঘুমাচ্ছ, নাকি কালা? লোকটি কখন থেকে ডাকছে, আর তুমি সাড়া দিচ্ছ না? গোপাল একটু হেসে জবাব দিল, আরও কিছুক্ষণ ডাকুক না। লোকে জানুক যে আমি এ গ্রামের মোড়ল হয়েছি। তাছাড়া বেশি বেশি না ডাকলে প্রচারটা হবে কীভাবে, বলতো?

প্রশ্ন উঠেছে, দলের জন্য কেমন নেতা চাই। তিনি কি কর্মীবান্ধব নেতা হবেন, নাকি দলবান্ধব হবেন? কর্মিবান্ধব নেতা বলতে মানুষ বুঝে থাকে, যে নেতা-কর্মীর তদবিরে সাড়া দেন, তার আপদে-বিপদে যিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন। এতে নিয়ম-নীতি ভাঙল কি মচকালো তাতে কিছু যায় আসে না। তর্কের খাতিরে ‘তদবির’কে আমরা যদি ইতিবাচক অর্থেও ধরে নিই তাহলে আমাদের জানা দরকার দেশের বড় দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে কর্মীর সংখ্যা কত হতে পারে? বিএনপি যেহেতু বিরোধী দলে আছে তাই এখন তাদের নিয়ে টানাটানি না-ই বা করলাম। তবে সরকারি দল আওয়ামী লীগের কর্মীর সংখ্যা কত হতে পারে তার একটা ধারণা নেওয়া যায়।

সারা দেশে চার হাজার ৫৫৪টি ইউনিয়ন আছে। প্রত্যেক ইউনিয়নে আবার ৯টি ওয়ার্ড। আওয়ামী লীগের নেতারা দাবি করেন, তাদের দলের ওয়ার্ড কমিটিও সক্রিয় আছে। আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে বলা হয়েছে, ওয়ার্ড কমিটি হবে ৫৫ সদস্যবিশিষ্ট। এখন প্রত্যেক ইউনিয়নে যদি কম করে হলেও আওয়ামী লীগের ১০০ জন সক্রিয় কর্মী আছে বলে ধরে নিই, তাহলে সারা দেশে দলটির কর্মীর সংখ্যা হয় সাড়ে চার লাখেরও বেশি। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, একজন কর্মীবান্ধব নেতার পক্ষে কি এই সাড়ে চার লাখের অধিক কর্মীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখা সম্ভব? এটা কি বাস্তবসম্মত? তাহলে কর্মিবান্ধব নেতার জিকির তুলে এটি নেতার ভালো গুণ বলে যে প্রচার করা হচ্ছে, তার নেপথ্যে কী আছে? এ বিষয়ে দলের উচ্চপর্যায় এবং রাজনৈতিক সচেতন মহলকে ভাবতে হবে। নেতা যখন দলীয় কার্যালয়ে কর্মীদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করে প্রবেশ করেন অথবা দলীয় কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আগে-পরে শতেক কর্মী তার পেছনে ছুটেন, তারা কারা? কী তাদের উদ্দেশ্য? নেতাইবা তাদের কেন আশকারা দেন। সারা দেশের লাখ লাখ কর্মী তো নেতার পেছনে দৌড়ান না। কর্মীদের কাজ তো নেতার আদর্শের পেছনে দৌড়ানো। এভাবেই তো একটা দলে কর্মী-সমর্থকের সংখ্যা বাড়ে। বাস্তবতা হচ্ছে, একজন নেতার পক্ষে বড়জোর কয়েকশ কর্মীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখা সম্ভব হতে পারে। লাখ লাখ কর্মীর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এটা বাস্তবসম্মতও নয়। নেতার সঙ্গে কর্মীর সম্পর্ক ঘটতে হবে আদর্শভিত্তিক। যারা সকাল-বিকাল দলীয় কার্যালয়ে বা দলীয় কর্মসূচির আগে-পরে নেতার পেছনে ছুটেন তাদের বেশিরভাগই ধান্দাবাজ কর্মী। এই ধান্দাবাজরাই সুযোগ-সুবিধা না পেলে বা না দিলে কোন নেতা কর্মীবান্ধব আর কোন নেতা কর্মীবান্ধব নন, সেই প্রশ্ন তোলেন। তাদের উদ্দেশ্য ব্যক্তিকেন্দ্রিক, দলকেন্দ্রিক নয়। এ স্বার্থান্বেষী মহলের বাইরে দলের তৃণমূলে যে লাখ লাখ কর্মী ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তাদের কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই।

একজন প্রকৃত নেতার কাজ কেবল দলের মুষ্টিমেয় নেতা-কর্মীকে সুবিধা দেওয়া নয়। দলে নিজস্ব বলয় তৈরি করে সংশ্লিষ্ট নেতা সাময়িক কর্মিবান্ধব উপাধি পেতে পারেন কিংবা দলীয় কর্মসূচিতে প্রশংসাসূচক স্লোগানে উল্লসিত হতে পারেন। তবে ভবিষ্যতে এটা দলের জন্য ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে। উন্নয়ন হতে হবে জাতীয়ভিত্তিক ও সমষ্টিগত। কর্মী আকৃষ্ট করতে হবে নেতার আদর্শ এবং গুণাবলি দিয়ে।

অন্যদিকে একজন দলবান্ধব নেতা তার রাজনৈতিক ধীশক্তি দিয়ে দলের সংকটকাল মোকাবিলা করেন। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত দিয়ে তিনি দলকে উদ্ধার করেন, দলের তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের দিক-নির্দেশনা দেন। ক্রমান্বয়ে দলবান্ধব নেতা থেকে তিনি দেশবান্ধব নেতায় পরিণত হন। সত্যিকারের নেতা কখনো কর্মীর পেছনে ছুটেন না। কর্মীরাই নেতার আদর্শের অনুসারী হন। এটাই চরম সত্য।

এই আলোচনার শুরুর দিকে নেতাকে কর্মীবান্ধব বলে প্রচার করে তাকে জনপ্রিয় প্রমাণ করার বর্তমান যুগের অভিনব আয়োজন নিয়ে কথা বলছিলাম। কিন্তু নেতার জনপ্রিয়তা কী কেবল কৃত্রিম প্রচার আর সঙ সেজে ঢং করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ? নেতা কী মনে করেন, জনগণের কোনো বোধ-বিবেচনা শক্তি নেই, তারা কৃত্রিমতা আর বাস্তবতার তফাত বুঝতে অক্ষম? দলে জনপ্রিয়তা অর্জনের সর্বজন স্বীকৃত উপাদান হচ্ছে নেতার প্রতি কর্মীর আস্থা ও বিশ্বাস। আর এই আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনের ভিত্তি হচ্ছে নেতার সততা এবং জনগণ ও দলের প্রতি ভালোবাসা ও অঙ্গীকার। জনগণের মন ও মননে নেতার জায়গা তৈরি হয় তার কর্ম এবং আচরণে। আর নেতা যদি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকেন তাহলে তাকে সব ধরনের নৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থাকাও জনপ্রিয়তা অর্জনের অন্যতম উপাদান।

সময় বুঝে অবস্থান বদল করা নেতার বহুরূপী চরিত্রের প্রকাশ ঘটে। ভাঁড়ামো ও মিথ্যাচার দিয়ে রাজনীতিতে জনপ্রিয়তা অর্জনের চেষ্টা করা আপাত কেউ সফল হলেও জনমনে কোনো দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে না। কারণ সব মানুষকে সব সময়ের জন্য বোকা বানানো সম্ভব নয়। নেতার প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চলতি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিকে তাকালেই একটু অনুধাবন করা যায়। এ নির্বাচনে সত্যিকার নেতার যে সংকট তা সে দেশের জনগণ উপলব্ধি করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, গত ৫০ বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এত খারাপ প্রার্থী আর আসেনি। কী ডেমোক্রেটিক কী রিপাবলিকান কোনো পার্টির প্রার্থীর প্রতি মার্কিন জনগণ আস্থা রাখতে পারছেন না। এক জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ মার্কিন ভোটার ডেমোক্রেটিক প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনকে ‘অবিশ্বাসী’ মনে করেন। আর রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প একজন অমার্জিত, উদ্ধত এবং সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি। মার্কিন জনগণ সে অর্থে কাউকেই ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করতে পারেনি। নির্বাচনে সে দেশের জনগণ একজন প্রেসিডেন্ট পেয়েছেন, কিন্তু একজন নেতা পাবেন কিনা তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে।

একইভাবে আমাদের দেশের ক্ষেত্রেও বলা যেতে পারে, ছলে বলে কৌশলে দল ও সরকারের উচ্চপদ বাগিয়ে নেওয়া যায়, কিন্তু কর্মী সাধারণের মন পাওয়া যায় না। সততা ও দেশপ্রেম দিয়েই সাধারণের নেতা হয়ে ওঠা যায়। রকমারি টিভি ক্যামেরার সামনে ঝকমারি কথা দিয়ে সাময়িককালের জন্য গণমাধ্যমে হিরো হওয়া যায়, কিন্তু গণমানুষের নয়নের মণি হওয়া যায় না। একজন সত্যিকারের নেতাকে দেখলে এই যুগেও রাজনীতির প্রতি মানুষের আগ্রহ জন্মে। মানুষের মধ্যে রাজনীতিমুখিতা তৈরি হয়। অন্তর থেকেই নেতার প্রতি ভালোবাসা জন্ম নেয়।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় আজকাল সমাজ বা রাষ্ট্রে ভালো মানুষ তথা সত্যিকারের নেতার অবস্থান অনেকটাই নড়বড়ে। আলোচনা ও প্রচারে এরা দুর্বল। দলবেঁধে চলাফেরা না করায় ভালো মানুষদের আজকাল দুর্বল ও অযোগ্য বলতেও কারও বাধে না। কিন্তু নেতা হওয়ার প্রথম ও প্রধান গুণটাই হলো আগে একজন ভালো মানুষ হওয়া। আর ভালো মানুষ বলতে আমরা তাকেই বুঝব, যিনি কারও উপকার করতে না পারলেও অন্তত কারও ক্ষতি করবেন না। দেশ ও জনগণের প্রতি থাকবে নেতার অফুরন্ত ভালোবাসা। তবে এই ভালোর দিকটি নির্ভর করে ব্যক্তির পারিবারিক ঐতিহ্য, তার বেড়ে ওঠা সর্বোপরি মনস্তাত্ত্বিকবোধ ও অনুশীলনের ওপর। প্রশিক্ষণ কিংবা গণমাধ্যমে কৃত্রিম প্রচার করে কাউকে নেতা বানানো যায় না। এসব কারণেই দল ও সরকারে বড় পদ পেলেও সবাই নেতা হয়ে উঠতে পারেন না। কেবল কেউ কেউ নেতা হন। তাই নেতার সংকট এখন সর্বত্র।

চোখের সামনে আমরা এখন যেসব নেতা দেখতে পাই বা টিভি চ্যানেল খুললেই যাদের চেহারা ভেসে ওঠে তাদের একটা বড় অংশকেই কেবল গলাবাজি করে নেতা হওয়ার চেষ্টা করতে দেখা যায়। তারা যা বলেন, তা বিশ্বাস করেন না। আর যা বিশ্বাস করেন, তা বলেন না। একটা নির্দিষ্ট দল করলেও তারা দলের মধ্যে দল সৃষ্টি করেন। নিজের মতাদর্শী না হলে একই দল করলেও তাকে বিপদগ্রস্ত করতে দ্বিধা করেন না। এদের সার্বজনীন চিন্তা ও আদর্শের অনুসারী কিংবা সৎ ও নীতিবান নেতা বলা সম্ভব নয়।

সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রবহমান পরিবর্তনের ধারায় জাতীয় ও দলগতভাবে নেতার উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যের উপযোগিতা কখনোই ম্লান হওয়ার নয়। নেতা হতে গেলে তার বুদ্ধিবৃত্তিক, বিচক্ষণ চর্চা ও দক্ষতার বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে তথাকথিত কর্মীবান্ধব নেতা না হয়েও সব কর্মী তথা জনগণের মন জয় করা সম্ভব। একইভাবে ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শী বা রাজনীতিবিমুখদেরও নয়নের মণি হওয়া যায়। তার জন্য সস্তা প্রচারণার দরকার পড়ে না।

লেখক : সাংবাদিক

Add Comment

Click here to post a comment





সর্বশেষ খবর