বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

এখন আমি ব্লু হোয়েলের ৫০তম ধাপে, আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়

কুমিল্লা সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র রয়েল সাহা। সোমবার দুপুরের দিকে ফেসবুকে তার দেয়া একটি স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘আমি এখন ব্লু হোয়েলের ৫০তম ধাপ খেলতে যাচ্ছি। আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়’।

রয়েল সাহার এ স্ট্যাটাসের প্রতিক্রিয়ায় তার ফেসবুক বন্ধু মো. লাল মিয়া লেখেন, ‘৪৯তম ধাপটা হলো- ২০দিন ফেসবুকে আসতে পারবেন না’। এ প্রতিক্রিয়ার জবাবে রয়েল সাহা লেখেন, ‘আমি গত ২০ দিন ফেসবুকে আসিনি’। রয়েল সাহার এমন জবাবে লাল মিয়া লেখেন, ‘তাহলে এহন মইরা যান!’ এর জবাবে রয়েল সাহা লেখেন, ‘পরপারে দেখা হবে।’ এরপর একটি হাসির চিহ্ন।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আইটি ইঞ্জিনিয়ার আল ইমরান মঙ্গলবার বলেন, ব্লু হোয়েল নিয়ে হইচই শুরু হওয়ায় আমি এই ডেথ গেমটির বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠি। ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে পেয়েও যাই গেমসটি। ২৫তম ধাপে গেমসটির কিউরেটররা আমাকে অযোগ্য ঘোষণা করে।

ঘটনার বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, সোমবার রাত ১২টার দিকে আমি গেমসটি খেলার চেষ্টা করি। ২৫তম ধাপে গেলে অ্যাডমিন প্যানেল থেকে আমাকে বলা হয়, আপনি বাঁ হাতের তর্জুনী দিয়ে বা কপালের পাশটা ম্যাসাজ করতে থাকুন। আমি জানাই, ওকে করছি। তারা পুনরায় জানায়, এবার আপনি ডান হাতের তর্জুনী দিয়ে ডান কপালের পাশটা ম্যাসাজ করুন। এবারও আমি তা না করেই জানাই, করেছি।

এ জবাব পেয়ে তারা জানায়, এবার আপনার অনুভূতি লিখুন। আমি লিখি, বিশেষ কোনো অনুভূতি তো পাচ্ছি না। এর জবাবে তারা জানায়, ইউ আর নট এলাউড। আল ইমরান বলেন, ব্লু হোয়েলের অ্যাডমিন যারা চালায় তারা অত্যন্ত বিচক্ষণ। না হলে তারা আমাকে ব্লক মারতে পারতো না। আমার ধারণা, প্রথম কয়েকটি ধাপেই তারা তাদের আদর্শ শিকার চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়। আর সে অনুযায়ীই একেকটি ধাপ সাজায়।

মঙ্গলবার হলিক্রস সহ রাজধানীর একাধিক নামি স্কুল-কলেজে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেছে, ব্লু হোয়েলের ভয়ঙ্কর বিস্তার। স্মার্ট ফোন ব্যবহার করে এমন বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই জানে, ডেথ গেমস ব্লু হোয়েল সম্পর্কে। ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজে (ডিআরএমসি) একাদশ শ্রেণির ছাত্র গোলাম রাব্বী।

তিনি জানান, গত এক মাস আগে থেকেই তিনি ডেথ গেমস ব্লু হোয়েল সম্পর্কে জানেন। কাছের এক বন্ধু তাকে ক্ষুদে বার্তায় এই গেমস সম্পর্কে জানায়। এরপর ব্লু হোয়েল গেমস নিয়ে নিজেদের মধ্যে চলে আড্ডা, আলোচনা। এনরয়েড ফোন ও ইন্টারনেটে ঘাঁটাঘাঁটি।

রাব্বী বলেন, আমার বন্ধুদের মধ্যে ইমন, রিফাত, সাব্বিরসহ আমার ক্লাসের একই শাখার ৮০ মতো শিক্ষার্থী- সবাই জানে এই ডেথ গেমস সম্পর্কে। কৌতূহল ও সাহসিকতার প্রতিযোগিতায় একে অন্যকে ছুড়েও দিচ্ছে ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জ।

ফার্মগেটের হলিক্রস স্কুলের আঙ্গিনা। বেলা ১২টা। নিজেদের মধ্যে খুনসুটি ও আড্ডায় শিক্ষার্থীদের কয়েকটি গ্রুপ। অরিত্রি রায়, ফাতিমুতুল সাদিয়া, লামিজা জারিন লাইজা, দীপান্তি শ্রাবণ ও রেহনুমা রহমত। সবাই নবম শ্রেণির ছাত্রী। নাম-পরিচয় জানার ফাঁকে ব্লু হোয়েলের প্রসঙ্গ তুলতেই সবাই একবাক্যে বলে, ‘আমরা তো প্রায় দু’মাস আগে থেকে ব্লু হোয়েলের কথা জানি। এই গেমে ঢুকলে আত্মহত্যাই শেষ পরিণতি। বিভিন্ন ধাপ অতিক্রমের শেষ পর্যায়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করতে হয়। আমাদের স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী স্বর্ণা এই গেম খেলে মারা গেছে।’

হলিক্রস স্কুলের সিনিয়র শিক্ষক শ্রীমন্ত রড রিক্সার বলেন, আমরাও শুনেছি স্বর্ণা ব্লু হোয়েল খেলে আত্মঘাতী হয়েছে। কিন্তু এটা তো বাইরের ঘটনা। স্কুলে তো শুধুমাত্র পাঠ্যবইয়ের ক্লাস অনুযায়ী সপ্তাহে এক বা দু’দিন কম্পিউটার ক্লাস করানো হয়। তাছাড়া, এসব কম্পিউটারে ইন্টারনেট সংযোগ নেই।

ব্লু হোয়েলের আসক্তিতে আত্মঘাতী হওয়া কিশোরী স্বর্ণা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে রাজধানীর ওয়াইডব্লিউসিএ হাইয়ার সেকেন্ডারি গালর্স স্কুলে। এ স্কুলে তার সহপাঠী ছিল জারিন তাসনিয়া তমি। তমি এখনো ওয়াইডব্লিউসিএ স্কুলের অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে।

তমি জানান, ৩রা সেপ্টেম্বর রাতে আমার সঙ্গে স্বর্ণার মোবাইল ফোনে কথা হয়েছিল। তখন সে তার এক ফেসবুক ফ্রেন্ডকে মিস করার কথা জানিয়েছিল। যদিও স্বর্ণার মৃত্যুর পর থেকে আমি ব্লু হোয়েলের কথা জানতে পারছি।

ডেফোডিল ইন্টারন্যাশনাল কলেজের ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের একাদশ শ্রেণিতে পড়ুয়া এক ছাত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমি বেশ কয়েক দিন আগেই ব্লু হোয়েল গেমের বিষয়ে জেনেছি। মোবাইল ও কম্পিউটারের মাধ্যমে অনেকেই সে সম্পর্কে জানছে। তাতে কৌতূহলও বাড়ছে অনেকের।

তরুণরা কেন আকৃষ্ট হচ্ছে ব্লু হোয়েলে? মনোবিদরা বলছেন, সহজ ও নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ এবং সাহস আছে কিনা এমন কথায় সাহস দেখাতে গিয়েই অনেক তরুণ ব্লু হোয়েলে আকৃষ্ট হচ্ছে। আর একবার এ ডেথ গেমসে ঢুকে পড়লে তা থেকে বের হয়ে আসা প্রায় অসম্ভব। -এমজমিন