জাতীয়

এক রাতে পরিবারের ১৮ সদস্যকে পুড়িয়ে হত্যা

‘দুই চোখ দিয়ে অনবরত গড়িয়ে পড়ছে পানি। বাম পায়ের গোড়ালি ব্যান্ডেজ করা। মাথার পেছনে ১০টি সেলাই। সারা শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন; বিভিন্ন স্থানে লালচে ঘা। কেউ সামনে দাঁড়ালে ফ্যালফ্যাল করে শুধু চেয়ে থাকেন। মুখে ভাষা নেই। যেন কথা বলতেই ভুলে গেছেন।’ এটি এক রাতে ১৮ জন স্বজন হারানো ও সেনাদের ভয়াবহ শারীরিক নির্যাতনে বাকরুদ্ধ রোহিঙ্গা সেবিকা বেগমের করুণ গল্প। দুই সপ্তাহ আগে এক রাতে মিয়ানমারের সেনারা তার পরিবারের ১৮ সদস্যকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে।
মিয়ানমারের রাখাইন (আরাকান) রাজ্যে সেনাদের হাত থেকে প্রাণে বেঁচে যাওয়া সেবিকা উখিয়ার কুতুপালং শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। তার সারা শরীরে সেনাদের অত্যাচার-নির্যাতনের চিহ্ন। বাবা-মা, ভাই-বোনসহ পরিবারের ১৮ সদস্যকে হারিয়ে ওই নারী নৌকায় টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন।

রাখাইন রাজ্যের তুলাতুলি গ্রামের বাসিন্দা সেবিকা বলেন, ঘটনার রাতে চারদিকে চিৎকার-চ্যাঁচামেচি ও মুহুর্মুহু গুলির শব্দে তাদের ঘুম ভাঙে। বিছানা থেকে ওঠার আগেই তাদের বাড়ি ঘিরে ফেলে কালো রঙের পোশাক পরা ও মুখে কাপড় বাঁধা ১০-১৫ সেনা। এ সময় সেনাদের সঙ্গে ছিল মগরা। সেবিকা বলেন, বাবা আলি আহমেদ ও মা ফেরজা খাতুনসহ তার পরিবারের সবাইকে ধরে ফেলে সেনারা। প্রথমে হাত ও চোখ বেঁধে সবাইকে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। এরপর বাড়িঘরে আগুন দিয়ে তার মধ্যে ঠেলে দেয়া হয় তাদের। সেখান থেকে কোনোমতে প্রাণে বেঁচে যান সেবিকা। তিনি আরও বলেন, সেনা ও মগ গোষ্ঠীর কাছে পরিবারের সদস্যদের প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছিলেন তার বাবা। ‘আমাদের প্রাণে মারবেন না’- তার বাবা এ কথা বলার পরপরই গুলি শুরু করে সেনারা। প্রথমে বাবাকে আগুনের মধ্যে ঠেলে দেয়া হয়, এ কথা বলেই ওড়না দিয়ে চোখ মোছেন সেবিকা। তার দুই হাত ও চোখ বেঁধে পায়ে গুলি করা হয়। তার সারা শরীর ব্লেড দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা হয়। তাকেও আগুনের মধ্যে ঠেলে দেয়া হয়। কিন্তু তিনি কোনোমতে বেঁচে গেছেন। তিনি জানান, তার সারা শরীর আগুনে ঝলছে গেছে। মাথায় তিনি মারাত্মক আঘাত পেয়েছেন। প্রায় ১০টির মতো সেলাই দেয়া হয়েছে। এখন শরীরের যন্ত্রণা ও চোখের পানি হয়েছে তার শেষ সম্বল। শুধু সেবিকাই নন সেনাদের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন হাজারও রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ। একই ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া নাফিজা বেগম বলেন, মগ দালালরা সুন্দরী মেয়েদের ধরে সেনাদের হাতে তুলে দেয়। নির্যাতনের পর তাদের হত্যা করা হয়। তিনি বলেন, হাজারও রোহিঙ্গা নারী সেনাদের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। পালিয়ে আসা মিজান আলী জানান, তার স্ত্রী মোমেনাকে ক্যাম্পে ধরে নিয়ে শারীরিক নির্যাতনের পর হত্যা করে তার লাশ নাফ নদীতে ফেলে দেয়া হয়েছে। ২৫ আগস্ট রাতে রাখাইনে একসঙ্গে ৩০টি পুলিশ পোস্ট ও একটি সেনা ক্যাম্পে হামলা চালায় আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (এআরএসএ)। ওই হামলায় নিরাপত্তা বাহিনীর ১২ সদস্যসহ ৮৯ জন নিহত হয়। এরপর রাজ্যটিতে সেনা  অভিযান শুরু হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।সূত্র- যুগান্তর