আন্তর্জাতিক ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ধর্ম

এক মেয়ে এসে আমাকে বলল, আমি ইসলাম ধর্ম ছেড়ে দিয়েছি সূরা আর রাহমান এর জন্য, কারণ…

বস্টনে এক মেয়ে এসে আমাকে বলল, আমি ইসলাম ধর্ম ছেড়ে দিয়েছি। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেন ছেড়ে দিয়েছেন? মেয়েটা বলল, সূরা আর রাহমান এর জন্য।

আমি বললাম, কেন? সূরা রাহমান আপনার কি ক্ষতি করেছে?

কুরআন কিভাবে আমাদের জন্যে রহমত সে ব্যাপারে কিছু বলি। আমি কাতারে সূরা আর-রাহমান নিয়ে কথা বলছিলাম। এখানে শুধু একটা জিনিস শেয়ার করবো। শুধু একটা বিষয়। আজকে ফিরে যাওয়ার সময় এই কথাটা ভাবতে থাকুন। সূরা রাহমান শুরু হয়েছে ‘আর-রাহমান’ দিয়ে। এটা আল্লাহর খুবই সুন্দর একটা নাম, তাই না? এটা আল্লাহর সেই নাম, যাতে ভালোবাসা আছে, যাতে স্নেহ আছে। আল্লাহর সেই নাম যা ‘রাহম’ শব্দটার সঙ্গে সম্পর্কিত। কত সুন্দর নাম আল্লাহর!

সে বলল, সূরা রাহমানে আল্লাহ শুরু করেছেন আর-রাহমান দিয়ে। তিনি বলছেন তিনি ভালোবাসেন, প্রতিপালন করেন, ক্ষমা করেন। অথচ সূরার মাঝখানে তিনি দোজখ নিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন। কিভাবে মানুষ সেখানে পুড়তে থাকবে। কিভাবে মানুষকে টর্চার করা হবে। কিভাবে আল্লাহ… যিনি ভালোবাসাপূর্ণ, রহমতদাতা, তিনি মানুষকে টর্চার করেন? তিনি কিভাবে এটা করতে পারেন?

আর আমার তার সাথে দীর্ঘ কথোপকথন হয়েছে এই নিয়ে। আমি শুধু একটা ব্যাপার বলতে চাই।
সূরা রাহমানে জাহান্নামের যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে তা সম্পূর্ণ কুরআনের সবচাইতে ভয়ংকর বর্ণনাগুলোর একটা। এই বর্ণনা ‘R’ রেটেড, এতে থাকা গ্রাফিক শব্দের কারণে এবং অত্যাধিক ভয়ংকর বিষয়বস্তুর জন্য।

আপনি শুনতে পাবেন এখানে জীবন্ত মানুষকে গরম পানিতে ফুটানো হচ্ছে। যখন তাদের ফুটানো হচ্ছে তারা অন্য পাশে থাকা আগুনের দিকে তাকিয়ে বলে, বোধ হয় আগুনে পোড়া এর থেকে ভালো। তারা ফুটানো পানি থেকে পালিয়ে আগুনের কাছে যায়। আগুন তাদের পুড়িয়ে ফেললে তারা ফুটন্ত পানির দিকে তাকায় আর বলে, না! আমি ফুটন্ত পানিতে যাব!

ও আল্লাহ! কি ভয়ংকর বর্ণনা… জাহান্নামে তাদের সাথে কি হবে তা নিয়ে। এই বর্ণনা শুনে আপনি কি ভয় পেয়েছেন? ভীত হয়েছেন একটুও? কারণ আমি শুনে যথেষ্ট ভয় পেয়েছি। আর যেই মাত্র আপনি ভয় পেলেন, তিনি কি বলেছেন?

وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتَانِ
সূরা আর রাহমান ৪৬।

যে তাঁর রবের সামনে দাঁড়াতে ভয় করলো তাকে দুটি জান্নাত দেওয়া হবে। আপনাকে ভয় দেখানোর মূল উদ্দেশ্য ছিলো নিশ্চিত ভাবে আপনাকে জান্নাত প্রদান করা। এটাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। তিনি আপনাকে ভয় দেখালেন আর তারপর বললেন, ভয় পেয়েছো? আচ্ছা, তোমার জন্য দুইটা জান্নাত। সুবহানাল্লাহ।

যখন তিনি আপনাকে ভয় দেখান এর বদলে ভালো কিছু উপহার দিয়ে দিলেন। আল্লাহ হলেন এমন। কিন্তু আমরা এমন না। আমরা শুধু মানুষকে ভয় দেখাতে ভালোবাসি। মানুষকে নেতিবাচক কথা বলতে পছন্দ করি।

এ সময়টা এই উম্মতের জন্যে এক বিষণ্ণ সময়। এই উম্মতের এখন প্রয়োজন ইতিবাচক বার্তার। আর এর জন্যে আল্লাহর কিতাবের চেয়ে ভালো বার্তা নেই… যা শুরু হয়েছে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে।

এই শব্দ আলহামদুলিল্লাহ… এর মানে হলো আমরা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ, আমরা আল্লাহর সমাদর করি সবকিছুর জন্যে। সময় যতই খারাপ থাকুক না কেন আমরা ইতিবাচক থাকবো কারণ প্রত্যেক নামায আমরা শুরু করি ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে।

যার মানে হলো আমাদের অবশ্যই ইতিবাচক হতে হবে। আমরা বিষণ্ণ হলে চলবে না, নেতিবাচক হলে চলবে না, রাগান্বিত হলে চলবে না, জাজমেন্টাল হলে চলবে না। আমাদের কৃতজ্ঞ এবং ইতিবাচক হতে হবে। এটাই আল্লাহর কিতাবের বার্তা। আমাদের এই জ্ঞানকে মনে ধারণ করতে হবে।

আমি দুআ করি আল্লাহ আযযা ওয়াজাল আপনাদের উপকৃত হওয়ার এবং অন্যদের উপকার করার ক্ষমতা দিন তাঁর কিতাবের প্রজ্ঞা হতে। আর আমি দুআ করি যেন আল্লাহ আমাদের সকলকে এই যোগ্যতা দিক যাতে আমরা অন্যদের জন্যে দৃষ্টান্ত হতে পারি এই কিতাবের বাণীকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে… নবীজীর (স) রেখে যাওয়া সুন্নাহ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে।

সবশেষে আমি একটা অ্যানাউন্সমেন্ট করতে চাই, এটা বলেই এই সন্ধ্যার আলোচনা শেষ করতে চাই। অ্যানাউন্সমেন্ট টা হলো, আপনাদের মাঝে যারা আমার সাথে কুরআন শিখার ব্যাপারে আগ্রহী,

আমি দুবাই সহসা আসতে পারবো না। আমি সহসা খালিজ আসতে পারবো না। আমি আমার বাচ্চাদের খুব মিস করি। আর আমার অনেকগুলো বাচ্চা… ৬ টা। এটা অনেক! আমি জানি এখানে কেউ কেউ ভাবছেন, ‘হাহ্‌! আমার তো ১২ টা আছে!’ তবে আমার জন্যে ৬ টা বাচ্চা অনেক। আর আমেরিকাতে এটা বিশাল সংখ্যা। আমরা সবাই পার্কে গেলে মানুষ বলে,

  • সবগুলো আপনার বাচ্চা?
  • হ্যাঁ, সবগুলোই আমার।
  • আপনারা তো একাই একটা গোষ্ঠী!
  • হ্যাঁ, ভাই।

তো আমি আমার সন্তানদের খুব মিস করি তাই বাসায় থাকতে চাই। আমি বাসায় থেকেই কাজ করতে চাই। তবে এর মানে এই না যে আমি আপনাদের কোনো উপকারে আসবো না। আপনি যদি আমার কোনো কাজ থেকে উপকার পেয়ে থাকেন তা সম্ভব হয়েছে কারণ বেশির ভাগ জিনিসই যা আপনি আমাকে করতে দেখেছেন তা এখানে হয়নি, আমি কাজটা করেছি টেক্সাসে বসে… আর সেখানে থেকেই আপনাদের দ্বারে পৌঁছাতে চেয়েছি।

আমি এটাই করতে চেয়েছি।
দুটি কোর্স… বিশেষ করে এখানে থাকা তরুণদের জন্যে, আমি দুইটা কোর্সের সুপারিশ করবো। আপনি যদি আমার কাছে এই দুটি কোর্স স্টাডি করেন তাহলে এটা আপনাকে কুরআন বুঝার ক্ষেত্রে একটা সুন্দর সূচনা তৈরি করে দিবে। শুধু এই দুটি কোর্স।

প্রথম কোর্সটা হলো “Divine Speech”। এটা ইউটিউবে নেই… ইউটিউবে একটা দুইটা ভিডিও থাকতে পারে এ সম্বন্ধে তবে সম্পূর্ণ কোর্স এর নাম “Divine Speech”। দ্বিতীয় কোর্স হলো “Quran for Young Adults”
প্রথম কোর্স কি ছিলো? (Divine Speech) দ্বিতীয় কোর্স কি ছিলো? (Quran for Young Adults)

আমি এই দুটি কোর্স করার পরামর্শ দিচ্ছি, বিশেষ করে এখানে অল্প বয়স্ক যারা আছে তাদেরকে। সেসব পরিবারকে যাদের বাচ্চারা ১০/১২ বছর বয়সের। তারা এই দুটি কোর্সই শুরু করতে পারবে। পরিবারের সকলে মিলে কোর্সটা করুন। এটা একটা মজবুত ভিত তৈরি করে দিবে কুরআন শিক্ষায় প্রবেশের আগে ইনশাআল্লাহ। কারণ আপনার একটা ছোটখাট সূচনা দরকার গভীরে যাওয়ার আগে। তো এটাই হলো ‘Divine Speech’ আর ‘Quran for Young Adults’ এর উদ্দেশ্য। আমি একটু বলে দেই ‘Divine Speech’ -এ কি নিয়ে কথা বলি।

মানুষ জিজ্ঞেস করে, আল্লাহ কুরআনে নিজেকে “আমরা” বলে সম্বোধন করেন কেন? মানুষ জিজ্ঞেস করে, কুরআনে সূরাগুলো ভিন্ন ভিন্ন অর্ডারে সাজানো কেন? মানুষ জিজ্ঞেস করে, কুরআনে বিষয়বস্তু ঘন ঘন পরিবর্তিত হয়ে যায় কেন?

সবাই যখন এসব প্রশ্ন করে আমি সকল প্রশ্নকে একত্রিত করে সব গুলোর উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছি যাতে আপনার আরও ভালো ধারণা সৃষ্টি হয় যখন আপনি কুরআন পড়ছেন এই বইয়ের বিশেষত্ব নিয়ে এবং যাতে সঠিকভাবে এর মূল্যায়ন করতে পারেন।

কারণ আপনি যখনই জবাব দিবেন তা কেমন হওয়া উচিত? যা বলা হচ্ছে তার থেকে আরও ভালো কিছু! যখন তারা আমাদের রাসুল সঃ কে অপমান করে তখন কি হয়? তখন আমরা কীভাবে জবাব দেই। ইউটিউব এ আপনারা মুসলমানদের কমেন্ট দেখবেন এরকম

‘হে কাফেররা আমরা তোমাদের ঘৃণা করি, আমরা তোমাদের হত্যা করতে যাচ্ছি, তোমরা …(গালি)… আল্লাহর জন্য গালাগালি !!!! কি সমস্যা আমাদের !! ইউটিউব এ বাজে মন্তব্য করা বন্ধ করুন।

কেউ আপনার কমেন্টকে গুরুত্ব দেয় না। আমাদেরকে এমন মানুষে পরিণত হতে হবে যারা পরিপক্বতার সাথে কথা বলে। আমাদের একটি বৈশিষ্ট হল আমরা হলাম বুদ্ধিবৃত্তিক জাতি। আমরা হলাম স্মার্ট মানুষ আমরা আবেগপ্রবন নই।

বর্তমান পৃথিবীর মানুষ আমাদেরকে আবেগপ্রবণ মানুষ হিসেবে মনে করে। আর এটা আমাদের ত্রুটি। কারণ আমরা এখনও আল্লাহর বই থেকে শিখিনি কীভাবে প্রজ্ঞার সাথে জবাব দিতে হয়। আমরা শুধু জানি কীভাবে আবেগপ্রবণ হয়ে জবাব দিতে হয়। আমাদের নিজেদের অবস্থান উন্নত করতে হবে।

”এবং সুন্দরতম পন্থায় তাদের সাথে বিতর্ক কর।”
মানুষকে বিচক্ষণতার সহিত দাওয়াত দেওয়া, কাউকে সাহায্য করা, উপদেশ দেওয়া- জানেন এসব ক্ষেত্রে কি হয়? একটা খুব বড় সমস্যা দেখা দেয়।

আমি যখন কাউকে উপদেশ দিচ্ছি, সমস্যা হলো মাঝে মাঝে আমি এটা ভেবে ফেলি যে আমি তার চেয়ে উত্তম। আমি ভাবি, আমি তার থেকে ভালো তাই তার আমার উপদেশের দরকার। আর এটা বেশ বড় সমস্যা বিশেষ করে যখন আপনি উপদেশ দিয়ে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। আপনি এতে ভেবে বসেন আপনি অন্যদের চেয়ে অনেক ভালো। শুনুন,

আমার কাছে মাইক আছে আর এই ১৮ টা ক্যামেরাম্যান আমার দিকে ক্যামেরা তাক করে রেখেছে কিন্তু এসবের কোনো মূল্য নেই। আমি কোনো অংশে আপনার চেয়ে উত্তম নই। আর আপনিও আমার চেয়ে উত্তম নন। শুধু আল্লাহই বলতে পারেন কে কার চেয়ে উত্তম। শুধুমাত্র আল্লাহ জানেন। এসব কোনো মর্যাদার মানদন্ড নয়, তা হতে পারে না। তাই আল্লাহ কি বলেছেন?

إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَن ضَلَّ عَن سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ
সূরা আল কালাম আয়াত ৭।
আপনার রব, তিনিই একমাত্র জানেন কে পথ হারিয়েছে, পথভ্রষ্ট হয়েছে সঠিক পথ থেকে।

আল্লাহ ভালো জানেন আমি বিপথে আছি নাকি আপনি। আমি তো এটাও জানিনা আমি নিজে সঠিক পথে আছি কিনা। এতটুকু জ্ঞান আমার নেই। আপনাকে পথনির্দেশনা দেওয়ার আগে আমার বুঝতে হবে আল্লাহই একমাত্র জানেন আমার মর্যাদা কতটুকু, আমার আসল অবস্থান কোথায়।

তো আমাকে আল্লাহর সামনে নত থাকতে হবে অন্য কাউকে উপদেশ দেওয়ার আগে। আমি কখনো বলি না, সুবহানাল্লাহ! এই লোকগুলো পুরোপুরি বিভ্রান্তির মধ্যে আছে, আমার এদেরকে সাহায্য করতে হবে। এটা ভাবার আগে একটু থামুন, আমি তো নিজের অবস্থান কোথায় তাও জানিনা।

আর দ্বিতীয়ত, যখন কাউকে উপদেশ দিচ্ছেন অথচ তারা আপনার কথা শুনছে না, তারা সেভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে না যেভাবে আপনি চাইছেন, তাদের কোনো রূপান্তর দেখা যাচ্ছে না, এর মানে কিন্তু এই না যে তারা পথভ্রষ্ট।

হয়ত কোনো বীজের অঙ্কুরোদগম হচ্ছে কিন্তু আপনি তা দেখতে পাচ্ছেন না। তবে আল্লাহ জানেন ভিতরে কি হচ্ছে। আমরা শুধু জানি বাহিরে কি হচ্ছে। আর বাহিরটা দেখেই আমরা অধৈর্য হয়ে পড়ি। তার ভিতরে কি হচ্ছে সে ব্যাপারে কোনো খেয়াল করিনা।

আর এটা আমার শেষ মন্তব্য। এই কথা দিয়েই আজ শেষ করতে চাই। কারণ এটা এই উম্মতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোর একটি। আজকের এই উম্মতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো জ্ঞানের অভাব। এই অভাবের উপস্থিতি বুঝা যায় যখন আমরা বাহ্যিক দিক দেখে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ি অথচ অন্তর্গত বিষয়গুলো নিয়ে ভাবি না… এমনকি ইসলামিক কর্মকান্ডেও। একটা ভালো ছেলে হলো সে, যে সম্পূর্ণ কুরআন মুখস্থ করে ফেলেছে।

কিন্তু এটা তো বাহ্যিক বিষয়। একজন ভালো মানুষ সেই, যার অনেক ইলম আছে। এটাও তো বাহ্যিক বিষয়। অন্তর্গত বিষয় নয়। আপনার অনেক ইলম থাকা সত্ত্বেও আপনি একজন জঘন্য মানুষ হতে পারেন। এটা সম্ভব, তাই না? আপনি হতে পারেন একজন হাফিয, কিন্তু আল্লাহ আর রাসূলের ব্যাপারে একবিন্দু পরোয়া করেন না। সম্ভব এটা? অবশ্যই!

কেউ হাফিয হলেই সে ভালো মানুষে পরিণত হয়না। হিফয খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমার সন্তানেরাও হিফয চর্চা করে। কিন্তু হিফয এই সমীকরণের খুবই ক্ষুদ্র একটা অংশ। আমাদের আগে অন্তরের সমস্যা দূর করতে হবে। এটাই সবচেয়ে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অন্য সবকিছুর চাইতে এর গুরুত্ব বেশি।

কিছু মানুষ বলে যতক্ষণ না তোমার অনেক ইলম অর্জন হবে, তুমি আল্লাহর কাছে কিছুই না। আমি তাদের বলবো, আমি জানি না আপনি কোন কুরআন পড়ছেন, কারণ এটা সেই কুরআনের শিক্ষা নয় যেটা আমি পড়েছি। এটা সেই কুরআনের বাণী নয়। রাসূলুল্লাহ (স) কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন আর সে সময় কিছু জিন সে পথ দিয়ে যাচ্ছিলো।

আপনারা জানেন গল্পটা? রাসূলুল্লাহ কুরআন পড়ছিলেন আর কিছু জিন সে পথ দিয়ে যাচ্ছিলো। জিনেরা কুরআন শুনতে পেল।
وَإِذْ صَرَفْنَا إِلَيْكَ نَفَرًا مِّنَ الْجِنِّ يَسْتَمِعُونَ الْقُرْآنَ فَلَمَّا حَضَرُوهُ قَالُوا أَنصِتُوا ۖ فَلَمَّا قُضِيَ وَلَّوْا إِلَىٰ قَوْمِهِم مُّنذِرِينَ
সূরা আল আহকাফ আয়াত ২৯।

একদল জিন আল্লাহর নির্দেশে সেই পথে যাচ্ছিলো, তারা যখন কুরআন শুনতে পেল, তখন বলল, ‘চুপ! এটা কি শুনতে পাচ্ছি?’

যখন সম্পূর্ণ তিলাওয়াত শেষ হলো তারা তাদের জাতির নিকট ফিরে গেল এবং দাওয়াহ দিতে শুরু করল। কতটুক সময় ধরে জিন জাতি কুরআন শুনেছিলো? কয়েক মিনিট? তারা কি তাফসীরের উপর কোনো ডিগ্রী পেয়েছিলো? পেয়েছিলো কোনো ডিগ্রী? তারা তাজউইদ এর ইযাযাহ পেয়েছিলো কোন প্রতিষ্ঠান থেকে? এই জিনেরা কুরআন শিখেছিলো… কতক্ষণের জন্যে? অল্প কয়েক মিনিটের জন্যে। অথচ এরপরে কি হলো?

তারা তাদের স্বজাতির কাছে ফিরে গিয়ে তাদের আল্লাহর কিতাবের প্রতি আহ্বান জানানো শুরু করলো। আর তাদের দাওয়াহ এতটা চমৎকার ছিলো যে আল্লাহ তা কুরআনের অংশে পরিণত করেছেন। আমরা এই কুরআনেই তাদের উক্তি পেয়েছি। এই জিনেরা কি উলামা? ফুক্বাহা? না! এরা সাধারণ জিন। তাদের প্রজাতির সাধারণ সদস্য। কিন্তু জানেন আল্লাহর কাছে তাদের অসাধারণ হওয়ার কারণ কি? তাদের আন্তরিকতা।

আমরা ধর্মকে জটিল করে দিতে পছন্দ করি কিন্তু আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে সহজ করতে পছন্দ করেন। আল্লাহর দ্বীন জটিলতামুক্ত… সুন্দর। এতটা সাদাসিধা যে একজন জিনও সেটা বুঝতে পারেন। অথচ তাদের কোনো পিএইচডি নেই। তবুও তারা বুঝতে পেরেছে।

আমরা সহজকে জটিল বানাতে পছন্দ করি। আমরা ইসলামের সব কিছু শিখাতে চাই জটিল উপায়ে। আর আল্লাহ তা শিখাতে চান সহজ সরল উপায়ে। এটাই আল্লাহর প্রজ্ঞা… সহজ করে দেওয়া। আমরা জটিলতা তৈরি করি। কেউ কুরআন পড়ছে আর আমরা গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করি, আপনি কোথা থেকে ইযাযাহ পেয়েছেন? এটা কি হাফস্‌? হাফস্‌ আল আসিম? নাকি ওয়ারশ্‌? আপনার তো কলকলা আরও লম্বা হওয়া উচিত ছিলো… মাদ ঠিক করতে হবে।

আপনি ৩ বছর অতিবাহিত করবেন তাজউইদ শিখতে অন্য সব বাদ দিয়ে। আপনি এই শিক্ষাকে কঠিন করেছেন। অতীতে কখনোই এমনটা হতো না। কখনোই না। আমরা দ্বীন শিক্ষা কঠিন করে ফেলেছি। আমরা নিজেদের এসব করতে বাধ্য করি।

আল্লাহ তো তা করেননি। আল্লাহ দ্বীনকে সহজ সরল রেখেছেন।
কেউ এসে বলল, ‘আমি একজন মুসলিম।’
(আপনারা জিজ্ঞেস করেন) ‘তাই নাকি? আপনি মুসলিম? আপনার আকীদা কি?’

-‘আমার আকীদা আমি একজন মুসলিম।’
-‘কিন্তু আপনি কি বিশ্বাস করেন?’
-‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।’
-‘না মানে, আকীদার উপর কোন বইটা পড়েছেন?

-‘আমি তো কোনো আকীদা বই পড়িনি। আমি কেবল জানি আল্লাহ একক সত্ত্বা।’
-‘না ভাই! আপনার আকীদা শিখতে হবে। আপনাকে এর গভীরে যেতে হবে। গভীরভাবে বুঝতে হবে।’
থামুন ভাই! কিছুকাল আগে ফিরে যাই। ইব্রাহীম (আ)… কুরআনে তিনি কি বলেছেন শুনুন। তা কঠিন নাকি সহজ? সহজ! অথচ আমরা কি পছন্দ করি? সবচেয়ে সহজ জিনিসটাকে কঠিন করে দেওয়া। আমরা এটা করতে খুবই ভালোবাসি।

তবে আমি বলছি না যে, আকীদা পড়বেন না। যারা তুল্লাবুল ইলম, যারা মুতামায়্যিয হবেন, যারা এসব ক্ষেত্রের শিক্ষার্থী হবেন, অবশ্যই আপনারা এসব পড়বেন! কিন্তু সাধারণ মানুষদের ছেড়ে দিন। তাদের জন্যে এসব সহজ করে দিন। কারণ ইব্রাহীম (আ) দ্বীনকে সহজ রেখেছিলেন, সালিহ (আ) সহজ রেখেছিলান, ঈসা (আ) সহজ রেখেছিলেন। তাঁরা ছিলেন আল্লাহর নির্ণীত মানবতার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। সবচাইতে সেরা শিক্ষক আমাদের নবীগণ (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম)।

আর তাঁদের শ্রেষ্ঠ কথাগুলোই কুরআনে স্থান পেয়েছে। আপনি ঈমান শিক্ষা দেওয়ার জন্যে আল্লাহর বইয়ের চেয়ে ভালো বই পাবেন না। তা সম্ভব নয়। অথচ আল্লাহ ইসলামকে সহজ রেখেছেন, আমরা কঠিন করে ফেলেছি। ওয়াল্লাহি! আমরা তা করি।আমরা মানুষের প্রতি নির্দয় অথচ আল্লাহ ক্ষমাশীল।

একদম শেষে আমি যেই ধারনা শেয়ার করতে চাই, আমাদের কোনো ভারসাম্য নেই…আমরা যেভাবে ইসলামকে মানুষের সামনে তুলে ধরি এতে করে মুসলিমদের জন্য ইসলাম পালন করা কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক মুসলিমের ধারণা তারা সব কাজেই আল্লাহর অবাধ্যতা করছে। আর আল্লাহ শুধু তাদের শাস্তি দিবেন। আল্লাহ সব সময় তাদের উপর রেগে আছেন। অথচ আল্লাহ নিজেই বলেছেন,
مَا يَفْعَلُ اللَّهُ بِعَذَابِكُمْ
সূরা আন নিসা আয়াত ১৪৭।

আল্লাহ তোমাদের শাস্তি দিয়ে কি করবেন?
আল্লাহ আপনাদের শাস্তি দিতে চান না। আমাদের আবার এই দ্বীনের রহমতের কথা প্রচার করতে হবে… এই কিতাবের রহমতের বাণী প্রচার করতে হবে। এই বৃষ্টির বর্ষণ হতে হবে আবার। বৃষ্টি আল্লাহর রহমতেরই এক নিদর্শন, তাই না? হ্যাঁ! তাই কুরআন আল্লাহর প্রেরিত রহমত, তাই না?

বারাকাল্লাহু লি ওয়ালাকুম। ওয়াসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।