আন্তর্জাতিক

ঋণ পরিশাধে মেয়েদের যৌনকর্মে বিক্রি করা হচ্ছে

মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন শহরের সেইক্কি খানাউংঢো এলাকায় একটি নোংরা পুকুরের ওপর কাঠের পাটাতনে তৈরি এক কক্ষের একটি বাড়িতে বাস করেন থান থান হিতুয়ে। সঙ্গে থাকেন পরিবারের আট সদস্য। ছোট্ট এই ঘরটিতে প্রতিদিন মশার কামড়ে অতিষ্ট থাকতে হয় তাদের। পুকুরের পানিতে জন্ম নেয়া মশা এসে জমে কম্বলের ভাজে।

ঘরের এক কোণে একটি সেলফের ওপর সাজানো টেলিভিশন। বৃষ্টির পানিতে যাতে না ভিজে, সেজন্য এক সময় ওই নিরাপদ স্থানে রাখা হয়েছিল টেলিভিশনটি। কিন্তু এখন আর এটি নিয়ে উদ্বিগ্ন নন এই নারী। চলতি বছরের শুরুর দিকে টিভিটি বন্ধক রেখে মহাজনের কাছ থেকে নগদ টাকা ধার নিয়েছেন তিনি।

নিজের পরিবারের জন্য রীতিমতো সংগ্রাম করতে হচ্ছে থান থান হিতুয়েকে। স্বামী বেকার হয়ে পড়ায় বোনের কাছ থেকে ৪০ হাজার কিয়াত (২৪০ টাকা) ধার আনতে হয়েছে তাকে। পুরো অর্থ একসঙ্গে কখনোই শোধ দিতে সক্ষম হন না তিনি। এজন্য লভ্যাংশ হিসেবে বোনকে দিতে হয় ২ হাজার কিয়াত। এক বছর পর গিয়ে দেখা যায়, আসল টাকার চেয়ে সুদের টাকাই বেশি দিতে হয়েছে। আর আসল আগের অংকেই আছে।

নিজের বোন সম্পর্কে হিতুয়ে বলেন, ‘সে আসলেই খুব কঠোর। সে রাস্তায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলে, আমি তোমাকে বিনাসুদে ওই টাকা দিইনি।’

হিতুয়েই ইয়াঙ্গুনে ঋণের ভাড়ে জর্জরিত একমাত্র একমাত্র নারী না। সম্প্রতি তিনটি শহরে সেভ দ্য চিলড্রেনের এক জরিপে দেখা গেছে, এসব শহরের ৮৫ ভাগ মানুষই স্থানীয় ঋণদাতাদের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছে। এই ঋণ তাদের তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয়তা পূরণ করলেও স্থায়ী একটি ঋণচক্রে আটকা পড়ে যান তারা। কখনো কখনো দিনে তাদের সুদ দিতে হয় পাঁচ শতাংশ। কখনো মাসে ৩০ শতাংশ।

এ বিষয়ে গ্রামীণ দারিদ্র্য বিষয়ক পরামর্শক মাইক স্লিংসবি বলেন, ‘আমি আমার জীবনের বেশিরভাগ সময় এশিয়ায় কাজ করেছি। ঋণের এত চড়া সুদ আর কোথাও দেখিনি। আমার দেখা সুদের হার সবচেয়ে বেশি এখানে।’

বাণিজ্যিক রাজধানী হওয়ায় মিয়ানমারের গ্রামীণ জনগণ কর্মসংস্থানের আশায় পাড়ি দেয় ইয়াঙ্গুনে। কিন্তু স্থায়ী চাকরি পাওয়া কঠিন এখানে। বেশিরভাগ লোকই এসে রিকসা চালায় কিংবা দিনমজুরের কাজ করে। এসব কাজ যেমন স্থায়ী না, তেমনি বর্ষা মৌসুমে থাকতে হয় বেকার। আর দেশটিতে বর্ষা থাকে প্রায় বছরের ছয় মাস।

সেভ দ্য চিলড্রেনের মতে, এসব এলাকার বাসিন্দাদের গড়ে প্রতিদিন ১ দশমিক ৪৮ ডলারের (প্রায় ১২০ টাকা) ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে হয়। বিশ্ব ব্যাংকের হিসাব মতে, কারও দৈনন্দিন খরচ ১ দশমিক ৯০ ডলারের (প্রায় ১৫০ টাকা) নিচে হলে তাকে দারিদ্র্যসীমার নিচে ধরতে হবে। অথচ মিয়ানমারে দেখা যায়, বেশিরভাগই দৈনিক ১ হাজার কিয়াতের (প্রায় ৬০ টাকা) বেশি খরচ করতে পারে না। ৫০ শতাংশ মানুষ শুধু খাদ্য কেনার জন্য ঋণ নেয়।

হিতুয়েকে স্কুল ছাড়তে হয়েছিল ১৬ বছর বয়সে। ফল বিক্রি করে সংসার চালান তিনি। তার দ্বিতীয় মেয়ে মাত্র এক বছর স্কুলে যেতে পেরেছে। ১৪ বছর বয়সে বিয়ে দিয়েছেন তাকে। তৃতীয় মেয়ের বয়স ১৪ হয়েছে। ঘরের কাজে মাকে সহায্য করে সে। পরিবারের ঋণের কারণে স্কুল থেকে ঝড়ে পড়ে। এই মেয়েটিকে এখন হয় শিশুশ্রমে যেতে হবে কিংবা এই বয়সেই বিয়ে দিয়ে দিতে হবে, অথবা এর চেয়েও খারাপ কিছু অপেক্ষা করছে ওর জন্য।

নৃবিজ্ঞানী ম্যাক্সিম বুট্রি বলেন, ‘পরিবারের ঋণ পরিশোধে দ্রুত অর্থ উপার্জনের কার্যকর উপায় হচ্ছে যৌনকর্ম। একটি পরিবার যখন ঋণ শোধ করতে পারে না, তখন শেষ উপায় হিসেবে মেয়েকে যৌনকর্মে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়।’

স্থানীয় এক ঋণদাতা

হিলায়িং থায়ার শহরের একটি বাঁশের তৈরি বাড়িতে বাস করেন মা এই পি। এক সময় সবজি বিক্রি করতেন। দেশের বাইরে জেলের কাজ করতো তার স্বামী। তখন পর্যন্ত সন্তানদের নিয়ে ভালই ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করে বাবা এবং স্বামী- দুইজনেরই মৃত্যু হয়। মৃত্যুটাও মিয়ানমারে একটি বড় ব্যবসা। লাশ সমাহিত করতে এবং ডেথ সার্টিফিকেট পেতে খরচ করতে হয় ১ লাখ কিয়াত। স্বামীর মৃত্যুর জন্য ক্ষতিপূরণ পেলেও বাবার মৃতদেহ সমাহিত করতে আরও ৫০ হাজার কিয়াত ঋণ নিতে হবে তাকে। কিন্তু প্রতিদিন পাঁচ শতাংশ সুদ দেয়াও সম্ভব না তার পক্ষে।

এই নারী বলেন, ‘আপনি যদি পরিবারের একটি নারী হন এবং শিক্ষা না থাকে- আপনার একমাত্র কাজ হবে যৌনকর্ম। জীবন এখানে খুব কঠিন, বিশেষ করে ইয়াঙ্গুনে। টিকে থাকার জন্যই আমাদের অর্থ উপার্জন করতে হয়। এখান থেকে আমি অনেক অর্থ আয় করতে পারি, আমার ঋণ শোধ করে দিতে পারি, আমার বাচ্চাদের খাবার দিতে পারি এবং পরিবারকে সহায়তা করতে পারি।’

প্রতিবেশীদের সঙ্গে আলাপ করেই যৌনকর্মীর কাজ শুরু করেছেন মা এই পি। ১২ বছরের মেয়ের সামনেই নিজের এই সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশ্যে বলে যাচ্ছিলেন তিনি। এই নারী বলেন, ‘এই এলাকার অন্য লোকদের চেয়ে আমি এখন আমার বাচ্চাদের অনেক ভাল খাবার দিতে পারি।’

২০১৫ সালে মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন এবং মান্দালা শহরের যৌনকর্মীদের ওপর একটি জরিপ করে কেয়ার ইন্টারন্যাশনাল। এতে বেশিরভাগ নারীই জানান, এই কাজে তাদের আসার কারণ, ঋণের বোঝা। প্রকৃতপক্ষে এতে সমস্যার সমাধান হয় না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাজের কোনও নিশ্চয়তা থাকে না। অনেক ক্ষেত্রেই আবারও ঋণের জালে আটকা পড়েন তারা। যেমন, গত মাসেও নিজের ননদের বাচ্চা জন্ম দেয়ার কাজে ৫০ হাজার কিয়াত ঋণ নিতে হয়েছে মা এই পিকে।

যৌনকর্মীদের ঋণ দিতে পারলে খুশি থাকে ঋণদাতারাও। তারা দ্রুত অর্থ পরিশোধ করতে পারে। তবে দৈনন্দিন খরচ আর ঋণের অর্থ পরিশোধের পর হাতে কিছু থাকে না তাদের। একজন যৌনকর্মী প্রতিবার সঙ্গমে উপার্জন করেন ১০ থেকে ১৫ হাজার কিয়াত। দিনে তিনবার এই কাজ করতে পারেন তারা। কিন্তু মিয়ানমারে এই পেশা বিপজ্জনক। ১৯৪৯ সালের আইনে যৌনকর্ম নিষিদ্ধ দেশটিতে।

মা এই পি বলেন, ‘নভেম্বর থেকে খুব বেশি খদ্দের পাইনি আমি। তখন থেকে গ্রেফতার অভিযান চলছে। পুলিশ আমাদের চিনে। আমরা কোথায় খদ্দেরের সঙ্গে কথা বলি, তাও জানে। তারা আমাদের ধরার অপেক্ষায় থাকে। তাদের টাকা না দিলে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়।’ তিনি জানান, কখনো কখনো পুলিশ এসে টাকা দাবি করে। গ্রেফতার এড়াতে স্থানীয় একটি গেস্ট হাউসে পুলিশের এক কর্মকর্তার সঙ্গে দৈহিক মিলন করতে হয় তাকে। পুলিশি হয়রানি এড়াতে আবার দালাল নিয়োগ দিতে হয়। কুমারী মেয়েদের এই কাজে আনতেও লাগে দালাল। এত খরচের পর আসলে তাদের কাছেও উল্লেখযোগ্য অর্থ থাকে না।

প্রতিটি কুমারী মেয়ের জন্য দালালদের দিতে হয় ৫০ হাজার কিয়াত। ঋণগ্রস্ত হতাশ পরিবারগুলো তাদের কুমারী মেয়েদের বিক্রি করে যৌনকর্মের কাজে। ম্যাক্সিম জানান, একেকটি কুমারী মেয়ের দাম প্রায় ৫ লাখ কিয়েত। তার ভাষায়, ‘এটা আসলেই বড় অংকের অর্থ।’ নিজের মেয়েকে নিয়েও শঙ্কিত মা এই পি। তাকে এই পথে আনতে চান না তিনি। পড়াশোনা করাতে চান। যৌনকর্মে আসার পর এসব মেয়ে আরও বেশি অরক্ষিত হয়ে পড়ে। এইডসসহ বিভিন্ন ধরনের যৌনতাবাহিত রোগে আক্রান্ত হন তারা।

তবে এতকিছু সত্ত্বেও মিয়ানমারের বিশাল দরিদ্র জনগোষ্ঠি জীবনধারণের তাগিদে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন যৌনকর্ম। মা এই পি বলেন, ‘এই কাজ কেউ চায় না। একান্ত বাধ্য না হলে এই পেশায় কেউ আসে না। আমাদের তো কোনও উপায় নেই।’ বিরাট এই দরিদ্র জনগোষ্ঠির জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে ব্যর্থ মিয়ানমার সরকারও। অনেকের ধারণা ছিল, অং সান সু চির দল ক্ষমতায় এলে দেশের উন্নয়ন হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে। কিন্তু বাস্তবে এখনও তার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।



আজকের জনপ্রিয় খবরঃ

গুরুত্বপূর্ণ অ্যাপ:

  1. বুখারী শরীফ Android App: Download করে প্রতিদিন ২টি হাদিস পড়ুন।
  2. পুলিশ ও RAB এর ফোন নম্বর অ্যাপটি ডাউনলোড করে আপনার ফোনে সংগ্রহ করে রাখুন।
  3. প্রতিদিন আজকের দিনের ইতিহাস পড়ুন Android App থেকে। Download করুন