বিনোদন

ঈদের নাটকগুলোর মধ্যে ওপরের সারিতে ‘বিকাল বেলার পাখি’

এবারের ঈদে প্রচুর ভালো নাটক হয়েছে। আলোচিত নাটকগুলোর মধ্যে ওপরের সারিতে রয়েছে আদনান আল রাজীবের ‘বিকাল বেলার পাখি। ‘

এই গল্পের উপাদান আমাদের খুব কাছেই, অতি নিকটে এমনকী হয়তো আমাদের ঘরের ভেতরেই  রয়েছে। কিন্তু সে অদেখা জিনিসটাকে নির্মাতা দেখিয়ে দিলেন কত সহজভাবে। আমাদের মধ্যবিত্ত জীবনের সুদীর্ঘ কাল ধরে চলে আসা কঠিন গল্পকে কত সহজ, কত সাবলীলভাবে উপস্থাপন করেছেন নির্মাতা। এক মধ্যবিত্ত পরিবারের পিতা ফজলুর রহমান বাবু। জীবন বিমা কম্পানিতে চাকরি করেন তিনি। মানুষকে পলিসি করিয়ে দেওয়ার জন্য এর-ওর পেছনে ধর্না দিতে হয়। আর এজন্য টিপ্পনি খেতে হয় সন্তান অ্যালেন শুভ্রকে। একদিন মহল্লার মাঠে খেলতে গিয়ে এমন টিপন্নি শুনে একজন বেধড়ক পেটান শুভ্র।

বাসায় নালিশ আসে, বাবা শুভ্রকে মারধর করেন, বাসা থেকে বেরিয়ে যায় শুভ্র। এগুলো আকমাদের মধ্যবিত্ত জীবনের, পাড়া মহল্লার দৈনন্দিন জীবনের খুবই সাধারণ ও নৈমত্তিক ঘটনা। এসব ঘটনাকে রাজীব যেন জীবন্ত করে দেখিয়েছেন। নাটকের প্রতিটি সিকোয়েন্সে যেন লুকিয়ে রয়েছে হাহাকার, কান্না মেশানো দীর্ঘশ্বাস। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই নিয়ে কম আলোচনা হয়নি। একেকজন শেয়ার করেছেন নিজের মনের কথা। সোশ্যাল মিডিয়ায় এক নারী তো রীতিমতো আদনান আল রাজীবকে দায়ী করে ফেলেছেন তার ঈদ ‘মাটি’ করে দেয়ার জন্য। অনেকেরই অভিযোগ তাদের ঈদ আনন্দ নষ্ট করেছে এই নাটক। চোখের সামনে সবসময় ভাসে সেই দুঃখময় দৃশ্য।

ফজলুর রহমান বাবুর স্ত্রী ইলোরা গহর। মধ্যবিত্তের সংসারের মায়েরা যেমন হন ইলোরা ঠিক তেমনি। সংসারের অভাবকে সামলে নিয়ে নিজেকে সুখি প্রমাণের চেষ্টায় ব্যস্ত থাকেন। ছেলে-মেয়ের দোষ-ত্রুটি তাদের বাবার সামনে যেন ধরা না পড়ে সে চেষ্টাই করে যান। শুভ্র’র বড় বোন বাবুর মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইফফাত তৃষা। মধ্যবিত্ত ঘরে সুশ্রী বিবাহপযোক্ত তরুণী। বাবা বিবাহের চিন্তায় ব্যস্ত থাকেন। তৃষার কোনো অভিযোগ নেই, যেমনটা থাকে না মধ্যবিত্ত সংসারের মায়ের। বাবাকে দারুণ ভয়, বাড়ি ফিরতে যদি দেরি হয়ে যায় তাহলে বিপদ, ভাইয়ের সাথে সখ্য গড়ে সকল অপরাধ ঢেকে ফেলে।

সংসারের ছোট্ট মেয়ে সাফা নমনি। বড় দুই ভাইবোনের সাথে দুষ্টুমি আর পড়াশোনাতে তার সময় কেটে যায়। সাফার অভিনয় তেমন না থাকলেও, অভাবের তাড়নায় বাবা যখন বাসার আসবাব পত্র বিক্রি করে দেন, সাথে চলে যায় ছোট সাফার  অ্যাকুরিয়াম। অ্যাকুরিয়াম না দেয়ার জন্য সাফার হৃদয় বিদীর্ণ করা কান্না দর্শক হৃদয় বিদীর্ণ করেছে, ভাসিয়েছে চোখের জলে।

এক অসহায় বাবা, মধ্যবিত্তের বাবা। সারামাস ধার-দেনা করে চলা, সামনে মেয়ের বিয়ে। ব্যাঙ্ক থেকে তুলে বেতনের টাকা নিয়ে ফেরা, ক্লান্ত শরীর আর বাসে টাকা হারিয়ে ফেলা এ যেন মধ্যবিত্ত বাবাদের হয়েই থাকে। টাকা হারিয়ে বাবুর হাহাকার দর্শক হৃদয়ে বেশ আঘাত করেছে। পুরো নাটক জুড়ে অ্যালেন শুভ্র চমৎকার অভিনয় করে গেছেন। আর এজন্যই তো কেঁদেছেন দর্শক। আর হয়তো নির্মাতার সার্থকতা এখানেই।

বিকাল বেলার পাখির চিত্রনাট্য লিখেছেন চারজন মিলে—আদনান আল রাজীব, মনিরুজ্জামান মনির, অন্বয় পাটওয়ারি, সাইদ আল নোমান সিয়াম। চিত্রগ্রহণ, কামরুল হাসান খসরু। সম্পাদনা, মোমিন বিশ্বাস।

 

এই নাটকে টিমওয়ার্কটা নিশ্চই বেশ চমৎকার ছিল। কেননা কাজের প্রতিটা ধাপে রয়েছে শিল্পের ছাপ, যত্নের ছাপ। যার জন্য প্রয়োজন ছিল সকলের কন্ট্রিবিউশন। অভিনেতা থেকে প্রডাকশন বয়, সবার। অনেকদিন পর মানুষ মনে রাখার মতো একটি নাটক দেখলো, এতো চমৎকার গল্প আর নির্মাণ- এমনই মন্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ার এক ব্যক্তির। বিকাল বেলার পাখির নাটক দেখিয়েছে এক অপারগ বাবার অসহায়ত্ব। সন্তানের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃসহ দৃশ্য, পিতার পরাজিত মুখ, এই মুখ তাকে ধ্বংস করে দেয়, বিধ্বস্ত করে দেয়।