জাতীয় শিক্ষা

ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে যত অনিয়ম ও নির্যাতন

ইংরেজি মাধ্যমে অ্যামেরিকান এবং ব্রিটিশ কারিকুলামের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আমার লেখাটা পড়ে ভুক্তভুগি অসংখ্য মানুষ ইনবক্সে তাঁদের বেদনা জানিয়ে আমায় অনুরোধ করেছেন আমি যেন তাঁদের অভিজ্ঞতা গুলো সর্ব সম্মুখে তুলে ধরি। আরেক দল ইংরেজি মাধ্যম স্কুল গুলোর শিক্ষক আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুবান্ধব, তাঁদের অভিমান মাখা স্বর, আমি কেন তাঁদের পরিশ্রম সততা এবং তাঁদের বেতন বৈষম্যের কথা তুলে ধরলাম না।

আমি লিখেছিলাম, বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে টিকে থাকতে হলে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। কিন্তু ব্রিটিশ এবং অামেরিকান ক্যারিকুলামের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোতে এখনও পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোন নীতিমালা না থাকার কারণে অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হচ্ছে প্রায় সবকটি স্কুল। প্রতিনিয়ত ক্রম বর্ধমান বেতনের চাকায় পিষ্ট হয়ে মধ্যবিত্ত অভিভাবকদের নাভিশ্বাস উঠে গেছে। বিনিময়ে স্বল্প বেতনের অভিজ্ঞতা এবং সম্পূর্ণ ট্রেনিং ছাড়া শিক্ষক। কোমলমতি শিশু-কিশোরদের সামনে যে আদর্শ, অনুপ্রেরণা, দেশপ্রেম, মূল্যবোধ এবং স্বপ্ন থাকার কথা বর্তমান স্কুল কর্তৃপক্ষ তা প্রদান করতে সম্পূর্ণ রূপে ব্যর্থ হচ্ছেন। কারণ তাঁরা মুনাফার ব্যাপারে যতটা সচেতন শিক্ষার ব্যাপারে ঠিক ততোটাই অজ্ঞ এবং অসচেতন। কারণ একটাই কোন প্রকার জবাবদিহিতা নেই।

শিক্ষকতা একটি পবিত্র পেশা । শিশুকালে আমাদের শিখানো হয়েছিল শিক্ষকরা পরম গুরু হিতৈষী দেশ গড়ার মূল কারিগর। দুঃখ জনক হলেও সত্য হাল আমলে আমাদের সন্তানদের সামনে এমন নীতি-আদর্শবান, দায়িত্বশীল শিক্ষকদের উদাহারন তুলে ধরতে ব্যর্থ হচ্ছি বারং বার।

বয়সে অপেক্ষাকৃত তরুণ দম্পতী যুগল, তাঁদের মেয়েটি নার্সারিতে পড়ে। হঠাৎ করেই স্কুলে যেতে চায় না, কারণ জিজ্ঞেস করলে কিছু বলেও না। একদিন মা লক্ষ্য করলো বাচ্চা মেয়েটির নরম তুলতুলে গালে লম্বা নখের আঁচর। মায়ের প্রাণ হু হু করে উঠলো, কারণ বাসায় বাচ্চা থাকার কারণে সবার বড় নখ রাখা মানা। অতএব ছোট্ট বাচ্চাটিকে বুকের মধ্যে নিয়ে আদর করে জিজ্ঞেস করা, ” তোমার গালে কে এই লম্বা আঁচর লাগিয়েছে”? আতংকগ্রস্থ মেয়েটি সঙ্গে সঙ্গে ফুঁপিয়ে কেঁদেকেটে জানান দিল, ”নাসরিন মিস” ।

আরেকজন মা’ জানালেন, তাঁর ছেলেটি ক্লাস থ্রিতে পড়ে। বাবা-মায়ের দাম্পত্য কলহ আপনজন ভেবে স্কুলের শিক্ষিকার সাথে শেয়ার করেছে। এরপর থেকেই বিপত্তি। এই তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে হাসা-হাসি আরও রঙ চড়িয়ে রগরগে বর্ণনা । প্রায় প্রতিনিয়ত শিশুটিকে খুঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে মারা ওর বাবা-মায়ের মাঝে নতুন কোন সমস্যা হয়েছে নাকি ! শিশুটি বিভ্রান্তির ভিতর পড়েছে ও’ বুঝতে পারছে না, ” উনারা এমন করছেন কেন, ওর কি দোষ”?

ক্লাস এইটে পড়া একটি কিশোরী মেয়ে ওর নিজের কথা লিখেছে, ”পহেলা বৈশাখে হাতাকাঁটা ব্লাউজ পড়ে গিয়েছি বলে স্কুল কর্তৃপক্ষ সামনে অপমান করে বেড় করে দিয়েছেন, অথচ টিচাররা পড়লে কোন দোষ হয় না। খুব স্বাভাবিক ব্যাপার, কেবল শিক্ষায় নয়, নীতি আদর্শে, পোষাকে-আসাকে ছাত্র-ছাত্রীরা তাঁদের শিক্ষকদেরকেই তো অনুকরণ করবে ।

ক্লাস সেভেনে পড়া সদ্য কৈশোরে পা ফেলা একজন ছাত্র, পুরো জীবনটাই যেন তাঁর কাছে রহস্যে ঘেরা স্বপ্ন। কি করতে হবে কি করা উচিত প্রতিটি ক্ষেত্রেই দ্বিধা গ্রস্থতা । তুচ্ছ এক ঘটনা নিয়ে মারামারি। শিক্ষক বিচার করে দিলেন, ” আজ থেকে কেউ আর ছেলেটির সাথে মিশবে না”। পরিণামে ছেলেটির একাকীত্বের যন্ত্রণায় মানসিক দহন, নিরুপায় ছেলেটি ধ্বংসকে আলিঙ্গন।

প্রতি মাসে মাসে যে বেতন নেওয়া হচ্ছে, তা কেবল শিক্ষা নয় রুমের এসি আরও বিভিন্ন পার্বণ এবং আনুষ্ঠানিকতার জন্য। কিন্তু প্রতিটি প্রোগ্রামেই পুনরায় শিক্ষার্থীদের নিজেদের টাকা ব্যয় করে পোশাক বানাতে হয়। কারণ স্কুলের টাকা একবার সিন্ধুকে ঢুকে যাওয়া মাত্রই যেন তালা খোলার চাবিটা হারিয়ে যায়। অতঃপর যত চাপ গার্জিয়ানদের ঘাড়ে।

একজন টিচার যখন পুড়নো হয়, অভিজ্ঞতা অর্জন করেন সঙ্গে তাঁর বেতনও বৃদ্ধি পায়। অতএব বেতন কমানোর জন্য অনভিজ্ঞ টিচার নিয়োগ। আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বান্ধবীদেরও একই অভিযোগ অতিরিক্ত যোগ্যতার কারণে তাঁদের সবসময় এক ধরনের চাপের মাঝে থাকতে হয়। যাতে বেশী বেতনের দাবী উঠতে না পারে। কম বেতনের জন্য কিংবা খাতিরের লোকের কেউ হলে সিম্পলি ও লেভেলস পাশ করা স্টুডেন্টদেরও উপড়ের ক্লাসের টিচার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে স্কুল কর্তৃপক্ষ পছন্দ বড়লোকের স্ত্রী, কন্যা, ডিভোর্সি কিংবা সিঙ্গেল নারী। কারণ তাঁদের ক্ষেত্রে অর্থের চাহিদা অতোটা থাকে না। কেবলমাত্র স্ট্যাটাস সিম্বল বা সময় কাটানোর জন্য কয়েক ঘণ্টা গৃহের বাইরে থাকা। অনেক সময় আনকোরা টিচার কি ভাবে কি করতে হবে বুঝতে না পেরে নিজের অস্তিত্ব জানান দিতে কেবলই শাসন, বৃথাই আতংক সৃষ্টির অপচেষ্টা।

২০১২ তে আমার মেয়েটা ক্লাস ফাইভে পড়ে। ওর বাবার সদ্য মৃত্যুর পর ওর ক্লাসের টিচার ওকে বলল,” বাবা না থাকলে একা মায়ের সন্তানরা উচ্ছৃঙ্খল হয়, লেখা পড়ায় ভালো হয় না”। কি সুন্দর সহজ সরলীকরণ ! এরা টিচার ! এদের কাছ থেকে আমাদের সন্তানেরা হতাশা ছাড়া আর কিছু প্রত্যাশা করতে পারবে না। বুকের মধ্যে নিয়ে আমি আমার সন্তানকে বুঝালাম, ” একা মায়ের সন্তানদের অনেক বেশী আত্মবিশ্বাসী, সৃষ্টিশীল, সাহসী, ধৈর্যশীল এবং প্রতিবাদী হতে হয়”। কারণ ওরা জানে অন্তরআত্মা এবং বিবেক জাগ্রত করতে বাবা-মা লাগে না, কেবল ইচ্ছেটুকুই যথেষ্ট।

ক্লাস টেনে পড়া একটি মেয়ে পা’ মচকে গেছে বলে সারা রাত ঘুমোতে পারেনি। মা জোড় করে ওকে স্কুলে পাঠিয়েছে যদি পড়াশুনার ক্ষতি হয় এই ভেবে। পায়ে স্যান্ডেল পড়া দেখে স্কুলের টিচার ভীষণ রেগে আগুন, গাল মন্দ শুরু করে দিলেন। মেয়েটিকে বাইরের রুমে বসিয়ে রাখলেন। কিন্তু সেখানেও বিপত্তি কারণ মেয়েটি পা লম্বা করে বসেছে। টিচারের সর্ব অঙ্গ রাগে ফুঁসে উঠলো। মেয়েটির আকুতির মুখে মা’কে ফোন দিলেন। মা’ বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলেন, ”মেয়েটা হাইয়ার অনার্স পাওয়া, ওর পড়াশুনার ক্ষতি হোক তিনি তা চাননি বলেই মেয়েটির অসুস্ত শরীরে স্কুলে যাওয়া”। কিন্তু দাম্ভিক টিচার মায়ের কথা মানবে কেন ! অতঃপর মেয়েটিকে মানসিক টর্চারে জ্বর এবং ব্লাড প্রেশার লো করে ছাড়লেন। সন্ধ্যায় মা’ অসুস্ত মেয়েকে দেখে অবাক ! অনুনয় করে ভয়ে মেয়ে মাকে জানালো এইটা নিয়ে ডাক্তারের সার্টিফিকেট সহ অ্যাপ্লিকেশন লিখে লাভ নেই। কারণ স্কুল কর্তৃপক্ষ পাত্তা দিবে না উল্টো ওর জীবনটাকে নরক বানিয়ে ছাড়বে।

সত্যি সত্যি ই কি আমাদের সন্তানরা এমন মিথ্যে সমাজ এবং নরক যন্ত্রণার মধ্যে বড় হচ্ছে। আমাদের সন্তানরা স্কুলে সারাদিন কিভাবে কাটায় আমরা তাঁর কতোটা জানি । টনক নড়ে যখন দেখি কারো আদরের সন্তান ড্রাগ এডিকটেড। গত বছর হলি আরটিজেনে এতোগুলো ইংরেজি মাধ্যমের ছেলেদের জঙ্গি মূর্তিতে দেখে যেমন সবার চক্ষু চড়ক গাছ।

ব্রিটিশ এবং অ্যামেরিকান কারিকুলামে ইংরেজি মাধ্যমে পড়া যেমন সময়ের দাবী তেমনই আমাদের সন্তানদের সুস্থ মানসিকতা, সঠিক মূল্যবোধ, আমাদের গৌরবময় স্মৃতিগাঁথা স্বাধীনতার ইতিহাস এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উজ্জীবিত ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিক পথে পরিচালিত করাটাও জরুরী। আর এই কঠিন কষ্ট সাধ্য পরিচালকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে শিক্ষককেই । অতএব সময় এসেছে আর দায়িত্বে অবহেলা নয়, বরং প্রমাণ করে দেখিয়ে দিন আপনারাই পারেন । রুক্ষ,খর খরে মেজাজী স্বার্থান্ধ টিচার নয় প্রতিশ্রুতিশীল,দায়িত্ববান, মায়াময় শিক্ষক সকলের কাম্য । স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা আপনাদের মেজাজ বা দম্ভ নয় বন্ধুসুলভ মায়াময় আশ্রয় হিসেবে দেখতে চায়।

Advertisements