মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

আস্থা রাখুন দেশের চিকিৎসকদের ওপর-ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী

%e0%a6%a1%e0%a6%be-%e0%a6%86%e0%a6%b6%e0%a7%80%e0%a6%b7-%e0%a6%95%e0%a7%81%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%9a%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%ac%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%a4কিছুদিন আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি বক্তব্য সবার নজর কেড়েছে এবং তা এ দেশের চিকিৎসক ও চিকিৎসাব্যবস্থায় ব্যাপক নন্দিত হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘আমি যদি অসুস্থ হই, তাহলে যেন আমাকে বিদেশে না নেওয়া হয়, দেশের হাসপাতালেই আমার চিকিৎসা হবে।’ প্রধানমন্ত্রীর এই অভিলাষ, এই আত্মবিশ্বাস, এ দেশের চিকিৎসক ও চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি তাঁর অকুণ্ঠ আস্থায় একজন চিকিৎসক হিসেবে আমি গর্বিত, অভিভূত। দেশের চিকিৎসকসমাজের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। কিন্তু কেন এ দেশের মানুষ চিকিৎসা নিতে বিদেশ যায়—এটা আসলেই বড় প্রশ্ন। এ দেশে কি তাহলে উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা নেই? নাকি বাংলাদেশের চিকিৎসকরা রোগীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন না? নাকি রোগ নির্ণয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে?

আসলে দেশের মানুষকে চিকিৎসক ও চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রদর্শনসহ আস্থা অর্জন করতে হবে। পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের রেফারেল সিস্টেম চালু করাও দরকার। এর জন্য দরকার মিডিয়ার ইতিবাচক খবর প্রকাশ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত নজরদারি এবং নতুন আর যেনতেন হাসপাতালের অনুমোদন না দেওয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া। গত এক দশকে বাংলাদেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় অভূতপূর্ব উন্নতিসাধিত হয়েছে। হৃদরোগের সাফল্য এখন প্রায় শতভাগ। এনজিওগ্রাম, এনজিওপ্লাস্টি, ওপেন হার্ট সার্জারি এখন নামমাত্র মূল্যে হচ্ছে এ দেশে। বাইপাস সার্জারি করতে পার্শ্ববর্তী দেশে পাঁচ লক্ষাধিক টাকা এবং সিঙ্গাপুরে ৪০ লাখ টাকার মতো খরচ হয়। আর বাংলাদেশে এর খরচ দুই থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে তিন লাখ টাকা। ক্যান্সার চিকিৎসায় বেশ কয়েকটি সেন্টার স্থাপিত হয়েছে, যেখানে রোগ নির্ণয় থেকে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা পর্যন্ত সম্ভব। জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট, উন্নত রোগ নির্ণয় যন্ত্রপাতি, মেডিক্যাল শিক্ষাসহ স্বাস্থ্য খাতের অর্জনও ঈর্ষণীয়। তাহলে এ দেশের মানুষ কেন বিদেশ যাচ্ছে?

যাদের অনেক টাকা আছে তাদের পাশাপাশি ‘ঘটি-বাটি’ বিক্রি করেও এ দেশ থেকে প্রতিদিন রোগীরা বিদেশ, বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে যাচ্ছে উন্নত চিকিৎসার আশায়। অথচ লাখ টাকার বিদেশের চিকিৎসা এ দেশে হাজার টাকায় সম্ভব। তার ওপর আসা-যাওয়ার ঝক্কি, ভিসা জটিলতা, খাবারের বৈষম্য, ভাষা বোঝার ও কথা বলার জটিলতা, আচার-কৃষ্টির এত ঝামেলার পরও রোগীরা যাচ্ছে বিদেশে। কিন্তু কেন? এর প্রধান উত্তর এ দেশের চিকিৎসক ও চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থার অভাব। এর উত্তর হতে পারে, মিডিয়ায় অতিমাত্রায় নেতিবাচক খবর প্রচার, যত্রতত্র ব্যাঙের ছাতার মতো মানহীন হাসপাতাল বা ক্লিনিক স্থাপন, হাসপাতালে রোগীর অযাচিত স্বজনদের দৌরাত্ম্যে সৃষ্ট আতঙ্কিত পরিস্থিতি, সেবা খাত তথা হাসপাতালগুলোতে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে রোগীদের আতঙ্ক, সর্বোপরি ডাক্তার-নার্সসহ সেবাদানকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পেশাদারির অভাব। স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বড় বড় অর্জন থাকা সত্ত্বেও সাধারণ গ্যাস্ট্রিক, আমাশয়, সর্দি-কাশির মতো অসুখেও মানুষ ভিড় জমাচ্ছে ভিসাকেন্দ্রে। সেখানকার ডাক্তাররা হয়তো ভালো ব্যবহার করে বলছেন, ‘দিদি, কোলকাতা কেমন লাগছে? আমার ঠাকুরদার বাড়ি কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে ছিল…!’

ব্যস, রোগী অমনি অর্ধেক সুস্থ। ডাক্তার বাবু আমার সঙ্গে কত গল্প করেছে! অথচ বাংলাদেশে ডাক্তাররা রোগীদের সঙ্গে কথাই বলেন না, ভ্রু কুঁচকে কথা বলেন! এই সামান্য কারণে মানুষ বিদেশে যাবে? এটা মেনে নেওয়া যায় না! আসুন, এই নেতিবাচক ধারণা পাল্টানোর চেষ্টা করি আজই।

কিছুদিন আগে আমার কণ্ঠস্বর পরিবর্তিত ছিল, ঠিক হচ্ছিল না। পেশাগত কারণে কথাও বেশি বলতে হয়। নাক কান গলা রোগ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর মাহমুদুল হাসান স্যারের চেম্বারে যাওয়া মাত্র FOL পরীক্ষায় ধরা পড়ল—ভোকাল কর্ড পলিপ (স্বরনালিতে টিউমার), একমাত্র চিকিৎসা অপারেশন আন্ডার জিএ। জানামাত্রই পরিবার-পরিজন, বন্ধুবান্ধব, শুভাকাঙ্ক্ষীদের এক কথা—এখনই ভিসা করো, বিদেশে যাও, এ দেশে অপারেশন করার দরকার নেই, তোমার জীবন অনেক মূল্যবান ইত্যাদি ইত্যাদি। নিজের সঙ্গে নিজে যুদ্ধ করলাম। না, আমি বিদেশে যাব না। বিদেশে গেলে এটা হবে আমার পরাজয়। আমার নিজের হাসপাতালে ওপেন হার্ট সার্জারি হয়, আর এই ছোট অপারেশনের জন্য বিদেশে গেলে আমি সারা জীবন ছোট হয়ে থাকব। অতঃপর আমার হাসপাতালেই সফল অস্ত্রোপচার করলেন প্রফেসর মাহমুদুল হাসান স্যার এবং তাঁর টিম। এক দিন পর বাড়ি গিয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় অফিস শুরু করলাম।

আমার ব্যক্তিগত উদাহরণ হয়তো কোনো সমাধান নয়। তার পরও বলছি, এ দেশের চিকিৎসকরা অনেক মেধাবী। তাঁদের ওপর আস্থা রাখুন।

লেখক : ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইউনিভার্সাল মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হসপিটাল (সাবেক আয়েশা মেমোরিয়াল হাসপাতাল), মহাখালী, ঢাকা

Add Comment

Click here to post a comment