খেলা-ধুলা

‘আমি মিরাজ মিরাজই থাকব’

e3c795e3491d6db48a44348fb757bae2-6র‌্যাডিসন ব্লু হোটেল থেকে খুলনার খালিশপুর। ঢাকার পাঁচ তারকা হোটেল থেকে খালিশপুরের দক্ষিণ কাশিপুর এলাকায় বাড়িটার দূরত্ব শুধু কিলোমিটারে মাপলে চলবে না। এ যে ভিন্ন দুই জগৎ। এক জগতে চাকচিক্য। ঝাড়বাতির মায়াবী আলোর বন্যা। বিছানার তুলতুলে আরাম। অন্য আরেক জগতে টিনের ঘর। চালে কার্তিকের চড়া রোদ পড়ে, বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ হয়। বৃষ্টি হলেই উঠোনে প্যাঁচপ্যাঁচে কাদা।
মিলও আছে। এখানেও মায়াবী আলোর রোশনাই। সে রোশনাই অকৃপণ, অকৃত্রিম চাঁদের।
আসল মিলটার কথাই অবশ্য বলা হলো না এতক্ষণ। মুদ্রার দুই পিঠের মতো ভিন্ন এই দুই জগতে তিনি একই। সেই একই সরলতা। একই মায়া মায়া হাসি, চাঁদের আলোর মতোই—অকৃপণ, অকৃত্রিম।
মেহেদী হাসান মিরাজ নিজের একান্ত জগৎটায় ফিরে এলেন সেই আগের মিরাজ হয়েই। যে মিরাজের নামের পাশে অভিষেক সিরিজে বহু বহু কীর্তি গড়ার কোনো ছাপ নেই। আছে বাবার বুকে ছুটে যাওয়ার আকুলতা। বোনের স্নেহময় আদর। আর এত এত প্রচারের আলো থেকে ঘোমটার আড়াল টেনে প্রায় অদৃশ্য হয়ে থাকা সেই মায়ের কোল।
পরশু সন্ধ্যায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে থেকে বিমানটা যখন আকাশে উড়তে শুরু করল, মনে হচ্ছিল, এই উড়ান যেন তাঁর ক্যারিয়ারের প্রতীক। সোজা উঠে যাওয়া। মিরাজ এ-ও জানেন, উঠে যাওয়াটাই সত্যি নয়। আবারও নেমে আসতে হয়। আর ঠিকমতো নামতে না জানলে সব ভেঙেচুরে যেতেও পারে। নিজের ক্যারিয়ারের প্রধানতম পাইলট মিরাজ শক্ত করেই ধরে আছেন, সজাগ চোখে। যে চোখে নিজেকে আরও শাণিয়ে নেওয়ার ক্ষুধা।
বিমানের জানালায় উঁকি দিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘২০১১ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৫ দলের হয়ে ভারত সফরে গিয়েছিলাম। সেবারই প্রথম বিদেশ সফর, প্রথম বিমানে ওঠা, প্রথম হোটেলে থাকা। সেই যে শুরু, চলছে এখনো।’
বয়সভিত্তিক ক্রিকেটেই ৮-১০টা বিদেশ সফর হয়ে গেছে মিরাজের। দেশেও থাকা হয়েছে বহু নামী-দামি হোটেলে। আর বিসিবি একাডেমি ভবন তো আছেই। বাড়িতে এলে অবশ্য সমাপ্তি টেনে দিতে হয় সেই জীবনের। অস্বীকার করার তো কোনো উপায় নেই, ওই জীবনটায় একধরনের সুখ আছে, স্বাচ্ছন্দ্য আছে। এতে অবশ্য বিন্দুমাত্র আফসোস নেই। মিরাজ বরং ভীষণ খুশি প্রিয় ঠিকানায় ফিরতে পেরে।
খালিশপুরের বাড়িতে এলেই তাঁর মধ্যে কাজ করে অদ্ভুত ভালো লাগা। মা মিনারা বেগম, বাবা জালাল তালুকদার, বোন রুমানা—প্রিয় মানুষগুলোর সান্নিধ্য যে এখানেই পাওয়া যায়। আর আছে বন্ধুরা। প্রিয় মাঠ। গুরু। এখানকার সতীর্থরাও।
এই ভাড়া বাড়িতেই বাস মিরাজের পরিবারের l প্রথম আলোএবার খুলনা সফরটা মিরাজ নিরিবিলিতেই সারতে চেয়েছিলেন। চাননি বেশি মাতামাতি হোক। কদিন পর আবার ক্রিকেটের ব্যস্ততা। বিপিএলের আগে মনটা সতেজ করতে মাত্র এক দিনের জন্য খালিশপুরের বাসায় ঘুরে আসতে চেয়েছেন। কিন্তু তা কি আর হয়! ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুই টেস্টে রেকর্ড ১৯ উইকেট পেয়েছেন। বিস্ময়-বালকের প্রতি মানুষের তুমুল আগ্রহ থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। হয়েছেও তা-ই।
শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে খুলনা, মিরাজকে এগোতে হয়েছে মানুষের ভিড় ঠেলে। কেউ জড়িয়ে ধরে, সেলফি তোলে, অটোগ্রাফ নেয়, কেউ একপলক দেখেই খুশি। এ কান-ও কান হয়ে কাল সকালেই খুলনায় ছড়িয়ে পড়ে মিরাজ এসেছেন। তাঁদের ভাড়া বাড়ির গলিটা এমনই সরু, পাশাপাশি দুজন মানুষের হেঁটে যাওয়াও যেন কঠিন। ওই সরু গলি দিয়েই সকাল-সন্ধ্যা পিলপিল করে মানুষ এসেছে-গিয়েছে। ‘আমার সঙ্গে আপনার আসাটা কাজেই দিয়েছে। এখানে না এলে কি এসব দেখতে পারতেন?’—নিজের শিকড়টা দেখাতে পেরে মুখে গর্বের হাসি।
মিরাজকে ঘিরে খালিশপুরে কাল উৎসব উৎসব ভাব। এই উৎসবের ফাঁকে সবাই দেখে নেয় তাঁর মলিন ঠিকানাটাও। এ নিয়ে মিরাজের অস্বস্তি নেই, নেই এতটুকু খারাপ লাগা। সাধ্যের ভেতর সর্বোচ্চ আতিথেয়তা দেওয়ার চেষ্টা করেন সবাইকে। ছোট্ট রুমটায় থরে থরে সাজানো তাঁর সাফল্যের স্মারকগুলো দেখে মানুষ চমকে ওঠে। কেউ কেউ টিপ্পনী কাটে, ‘কদিন জাতীয় দলে খেললেই তো ঢাকায় ফ্ল্যাট কিনে ফেলবা!’
মিরাজ অবশ্য তাতে সায় দেন না। ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কোনো চিন্তা তাঁর নেই। খেলার জন্য হয়তো রাজধানীতেই থাকতে হবে। তবে ভবিষ্যতে যা-ই হোক সব খুলনাতেই। এই শহরে তাঁর বেড়ে ওঠা, এই শহরেই স্বপ্নের জাল বোনা। জোর দিয়েই বললেন, খুলনা ছেড়ে তিনি কোথাও যাবেন না।
অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেটে বয়সভিত্তিক ক্রিকেট থেকেই আলো ছড়ানো মিরাজ মাত্রই জাতীয় দলে এসেছেন। এখনো অনেক পথ বাকি। ধারাবাহিক ভালো খেললে তারকা হয়ে উঠবেন নিশ্চয়ই। মিরাজের অবশ্য তারকার জীবনে কোনো আগ্রহ নেই, ‘আমি যত দূর যাই, যেখানেই যাই, এই জীবনটাই খুঁজে নেব। যে সাধারণ জীবনের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছি, সব সময় এমনই থাকার চেষ্টা করব। আমি মিরাজ মিরাজই থাকব।’
মিরাজ এখন তা-ই আছেন। এত চোখধাঁধানো সাফল্যে আর যা-ই হোক, তাঁর চোখ ধাঁধায়নি। সেখানে আশ্চর্য সরলতা।

আরও পড়ুনঃ  বাংলাদেশে এবার খুজে পাওয়া গেল রাবার মানব!! নিজের শরিরকে যেভাবে ইচ্ছা বাকাতে পারে! দেখুন (ভিভিও)

Advertisements

Add Comment

Click here to post a comment