জাতীয় ধর্ম মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

আত্মীয়তা রক্ষার তাগিদ দিয়েছে কোরআন-মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী

বিশ্ব এগিয়ে চলেছে দুরন্ত গতিতে। গতিময় পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে অনেক কিছুই পেছনে ফেলতে হয়েছে মানুষকে।
এর মধ্যে এমন কিছু অমূল্য সম্পদও রয়েছে যা মানুষের এগিয়ে যাওয়া জীবনকে ব্যর্থ করে দিচ্ছে। মানুষ বুঝতে পারেনি এত গতির সঙ্গে চলেও কেন সে পিছিয়ে যাচ্ছে। কীসে তার সুন্দর জীবনকে বিষাদ-বিষণ্ন করে তুলছে। চারপাশে তাকিয়ে থেকে গতির পৃথিবীতে সে এগিয়ে চলছে। কিন্তু তার পাশে নেই কোনো স্বজন-প্রিয়জন-আপনজন। যারা আছে তার মতোই তারাও একেকজন গতিমানব। স্বজনহীন গতিময় জীবন বিষিয়ে উঠছে প্রযুক্তিমোড়া মানুষের কাছে। তখন সব থেকেও অজানা শূন্যতা ভিতরে ভিতরে গুমড়ে কাঁদে। এ শূন্যতার নাম হলো প্রেম। ভালোবাসা। স্বজনদের ছোঁয়া। আপনজনদের স্পর্শ। প্রযুক্তি আমাদের সব দিয়েছে কিন্তু প্রিয়জনদের ছোঁয়ায় যে স্বর্গীয় তৃপ্তি রয়েছে তা দিতে পারেনি। তাই তো আজকের পৃথিবীতে বিষণ্নতায় ভোগা মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

জীবনকে উন্নত করতে আর সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে আমরা ছেড়েছি স্বজন-আপনজনদের। বেছে নিয়েছি ফ্ল্যাটবন্দী নরকের জীবন। যেখানে শুধু স্বার্থপরতা আর নির্দয় হৃদয়েরই চর্চা হয়। তাই তো বছরের পর বছর চলে যায় গ্রামের ছোট্ট কুটিরে জীর্ণ দেহের বৃদ্ধ মা কিংবা অসুস্থ বাবার খোঁজ নেওয়া হয় না। দরিদ্র ভাই, অভাবী বোনকে একটা ফোনও করি না এই ভয়ে না জানি আমার কাছে কিছু চেয়ে বসে। ফুফু-খালা, মামা-কাকাদের নামও জানে না অনেকে। কে কোথায় থাকে এ তো রীতিমতো ভিনগ্রহের অজানা খবরের চেয়েও বেশি অজানা শহুরেদের কাছে। আফসোস! এ চিত্র আর কারও নয়, মানবতার ধর্ম, শান্তির ধর্ম ইসলামের অনুসারীদের। কোরআনের অনুসারী মুসলমানদের প্রায় সবার। আপনজনদের খোঁজখবর নেওয়া, তাদের সঙ্গে সুম্পর্ক রাখা নামাজ-রোজার মতোই ফরজ। আজ নামাজের ওয়াজ হয়, হজের প্রশিক্ষণ হয়, কোরআনের তালিম হয় কিন্তু আত্মার অংশ আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখার ব্যাপারে তেমন কোনো কথাবার্তা শোনা যায় না। ফলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ মুসলিম দেশের অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বাবার মৃত্যুর খবর শুনে সন্তান বলে আঞ্জুমানকে ফোন করে দাফনের ব্যবস্থা করা হোক! সরকারের উচ্চপদস্থ তিন কর্মকর্তার মায়ের দুর্বিষহ জীবনের চিত্র উঠে আসে সংবাদ মাধ্যমে। খবরে যা আসে তা তো বাস্তবের কণা মাত্র, বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ।

পাঠক! আমাদের সমাজ কেন এমন হয়ে গেল? কেন আমরা আত্মীয়দের সঙ্গে পরের চেয়েও বেশি পরের মতো আচরণ করি? কারণ, আমরা জানিই না আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করাই ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলোর একটি। দেখুন কোরআন কত গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি উল্লেখ করেছে— ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর, কোনো কিছুকে তার সঙ্গে শরিক কর না, পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন এবং এতিমের সঙ্গে সুন্দর আচরণ কর। ’ (সূরা নিসা : ৩৬)। লক্ষ করুন, আল্লাহর ইবাদত করা, শিরক না করা এবং পিতা-মাতার খেদমতের সঙ্গেই সমান গুরুত্ব দিয়ে আত্মীয়দের সঙ্গে সদাচরণের কথা বলা হয়েছে। এ থেকেই তো বোঝা যায়, সুন্দর ধর্মীয় জীবন এবং সমাজ জীবনের জন্য আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখা কতটা তাৎপর্যপূর্ণ।

মানুষ আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষায় পিছিয়ে যায় দুই কারণে। গর্ব-অহংকার ও কৃপণতা। মানুষ ভাবে, আমি কেন তার খোঁজ নেব? সে পারে না? দায়িত্ব কি আমার একার? তার কোনো দায়িত্ব নেই? আবার অনেকে ভাবে আগ বাড়িয়ে কথা বলতে গেলে খোঁজ নিতে গেলে দাম কমে যাবে। এমন ভাবনাও মানুষ ভাবে— ভাইয়ের সঙ্গে, বোনের সঙ্গে, খালার সঙ্গে কথা বললে, দেখা করলে তো আমার কিছু খরচাপাতি হবে। দেখাও হলো না খরচও হলো না। এসব বিশ্লেষণ করেই আয়াতের শেষের দিকে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘বান্দা! অহংবোধের কারণে বা খরচের ভয়ে আত্মীয়তার রশি ছিঁড়ে ফেলছ, মনে রেখ! আমি কিন্তু দাম্ভিক এবং কৃপণকে পছন্দ করি না। এ ধরনের মানুষের জন্য আমি প্রস্তুত রেখেছি হাবিয়া দোজখ। ’ (সূরা নিসা : ৩৬-৩৭)। আত্মীয়তা রক্ষার ব্যাপারে হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, আত্মীয়তাকে সৃষ্টির পর সে আমাকে জাপটে ধরে কাঁদতে থাকে। বলে, হে আল্লাহ! তোমার বান্দারা আমাকে ছিন্ন করবে, রক্ষা করবে না। আল্লাহ বলেন, কথা দিলাম, যে তোমাকে রক্ষা করবে, আমিও তাকে রক্ষা করব। আর যে তোমাকে ত্যাগ করবে আমি আল্লাহও তাকে ত্যাগ করব। (মিশকাত)। এ হাদিসের সমর্থনে রসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করেছে, সে কখনো জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। (বোখারি)। হজরত উসমান (রা.) সবসময় তার মজলিসে বলতেন, ভাই! এখন আমরা দোয়া করব। এ মজলিসে যদি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী কেউ থেকে থাকেন দয়া করে উঠে যান। কারণ, এ ধরনের জঘন্য অপরাধীর দোয়া আল্লাহ কবুল করেন না। ভয় হয় তার কারণে আমাদের দোয়াও বুঝি কবুল হবে না। আত্মীয়তা অটুট রাখার ব্যাপারে এবং ছিন্ন করার ভয়াবহতা নিয়ে এত বেশি হাদিস রয়েছে যে তা বলে শেষ করা যাবে না। তাই পাঠকের উদ্দেশে বলছি, গতির পৃথিবীতে খুব বেশি দৌড়াতে গিয়ে স্বজন-প্রিয়জনদের মতো অমূল্য সম্পদ ফেলে যাবেন না। দুনিয়া ও আখেরাত দুটোই খোয়াবেন তাহলে। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে আত্মার বন্ধন আত্মীয়তা অটুট রাখার তৌফিক দিন। আমিন।

লেখক : বিশিষ্ট মুফাসসিরে কোরআন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব

www.selimazadi.com