মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

আওয়ামী লীগের সম্মেলন প্রসঙ্গে-নূরে আলম সিদ্দিকী

নূরে আলম সিদ্দিকী

২২-২৩ অক্টোবর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২০তম সম্মেলনটি শেষ হলো। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সম্মেলনটি বাহ্যিক দিক থেকে যতটুকু জৌলুসপূর্ণ ছিল, ততখানি বুদ্ধিদীপ্ত বা চৌকস ছিল না। সেখানে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বেশকিছু দৃশ্যমান ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়েছে। যেগুলো ইচ্ছা করলেই পরিহার করা যেত। সংস্কারপন্থির তকমা পেয়ে যারা প্রেসিডিয়াম সদস্য থেকে অবনমিত হয়ে দন্তবিহীন ব্যাঘ্রের মতো সরকারে কোনোরকমে অস্তিত্বটুকু ধরে রেখেছেন— দীর্ঘকালীন সম্মেলন চলার কোনো এক মুহূর্তে তাদের দিয়ে একটু শুভেচ্ছা বক্তব্য দেওয়াতে পারলে নেত্রীত্রয়েরও মুখ রক্ষা হতো এবং এমন অপরিশীলিত অবস্থাটি দেখা যেত না। জেলা কমিটির সম্পাদকদের রিপোর্ট পেশ করার আগে অনায়াসেই সময়টি বের করা যেত। কেউ কেউ বলেন, বর্তমান আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের গণ্ডারের চামড়া। অপমান, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য তাদের নিতান্তই গা-সওয়া। বিদেশি অতিথিদের বক্তব্যের পাশাপাশি সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে দিয়ে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেওয়ালে আওয়ামী লীগের অমিত শক্তিধর নেতৃত্বের বিপক্ষে তো যেতই না, বরং তা সহনশীলতা ও প্রতিপক্ষকে সম্মান প্রদর্শনের একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিস্থাপিত হতো।

সম্মেলনে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছাড়া কাউন্সিলে সভাপতিমণ্ডলীর নাম ঘোষণা কিছুটা হলেও নতুনত্ব এনেছে। কিন্তু কাউন্সিলেই পুরো কমিটি দিতে পারলে আরও পরিমার্জিত হতো। নতুন কমিটিতে প্রেসিডিয়ামের তিনটি পদ মুলো ঝুলিয়ে রাখার মতো এখনো শূন্য রেখেছেন। এর উদ্দেশ্য এবং রহস্য একমাত্র শেখ হাসিনাই জানেন। তবে এ নিয়ে ছোটাছুটি বা বিরামহীন দায়-দরবারের, তদবির-তাগাদার জন্য অন্তহীনভাবে অনেকেই ছুটছেন। আমি সম্মেলন প্রশ্নে বহুবার উল্লেখ করেছি, যখন কর্তার ইচ্ছায় কীর্তন হয়, তখন কীর্তনটির বিষয়ে কর্তা আগে থেকে গায়ককে অবহিত করে রাখলে কীর্তনিয়াদের জড়তা থাকে কম। এ সম্মেলনেও শেখ হাসিনার বন্দনা অর্চনা ছিল যথাপূর্বং তথাপরং। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার বর্ণনা গাইতে গিয়ে শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে সব নেতাই খালেদা জিয়ার পিণ্ডি চটকেছেন, চৌদ্দ-পুরুষ উদ্ধার করেছেন। অথচ এটি এখন সর্বজনবিদিত যে, বেগম খালেদা জিয়া সন্ধ্যার অস্তমিত সূর্যের মতো ম্রিয়মাণ, নিষ্প্রভ। প্রতিবাদ তো নেই-ই, দুর্নীতির প্রশ্নেও তিনি মুখে কুলুপ এঁটেছেন। প্রশাসন, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক সবাই আজ প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার দিকে এতটাই দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটছেন যে, তাতে মনে হয় বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের বাইরে মানুষ তো দূরে থাক, জীবন্ত অন্য কোনো প্রাণী পর্যন্ত যেন নেই। দেশের অযুত মানুষ ম্লান মুখ মুখে এই করুণ দৃশ্যটি ব্যথিত চিত্তে কেবলই অবলোকন করছে। অন্যদিকে সার্বিকভাবে দেশটি প্রতিটি সেকেন্ডে ক্রমান্বয়ে অবক্ষয়ের অতলান্তে নিমজ্জিত হচ্ছে। যেটি প্রান্তিক জনতার কাম্য না হলেও এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার কোনো পথ তাদের কাছে অজানা।

সম্মেলনে বিএনপির কেউ আসেননি। এলে আওয়ামী লীগের চেয়ে তারাই বেশি লাভবান হতেন নিঃসন্দেহে। এখানেও কথা থেকে যায়। শেখ হাসিনা কৌশলী ও দূরদর্শী হলে বেগম খালেদা জিয়াকে ব্যক্তিগতভাবে অন্তত টেলিফোনে নিমন্ত্রণ করলে তার হৃদয়ের ঔদার্য ও খালেদা জিয়াকে উপস্থিত করার জন্য তার সহনশীলতা ও উদ্বেলিত চিত্তের প্রকাশ পেত।

সম্মেলনকে কেন্দ্র করে জাতির জন্য তিনি আরেকটি দিক উন্মোচিত করতে পারতেন। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী আজকের বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সম্মানপ্রাপ্ত, বিশ্ব অলিম্পিকে মশালবাহী ড. ইউনূসকে বিশেষ বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ জানাতে পারতেন। পাঠকের সুবিধার্থে উল্লেখ্য, যে কোনো সমাবর্তন অনুষ্ঠানে চ্যান্সেলর ডিগ্রি প্রদান করেন, আর দেশ-বিদেশ থেকে যে কোনো বিশেষ ব্যক্তিত্বকে সমাবর্তন বক্তা হিসেবে নিয়ে আসা হয়। আমেরিকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সম্ভাব্য বিজয়ী প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন এই সেদিন বললেন, প্রফেসর ইউনূসকে পারিবারিক বন্ধু হিসেবে পেয়ে তিনি শুধু পুলকিতই নন, গর্বিত। আমার জানামতে, তিনি বাংলাদেশের প্রচণ্ড শুভাকাঙ্ক্ষী এবং কোনো দিন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোথাও একটি শব্দও বলেননি। সম্মেলন উপলক্ষে দল ও শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে তাকে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানিয়ে সুবিধামতো সময়ে একটা শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদানের ব্যবস্থা করলে বাংলাদেশের জন্য তা সবদিক থেকেই কল্যাণকর হতো। বাংলাদেশের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক ক্রমান্বয়ে শীতল হচ্ছে। এই শীতলতা একটা পর্যায়ে মারাত্মক রূপও নিতে পারে। এর ভয়াবহ পরিণতি না ভেবে বিলাসী বামরা অর্বাচীনের মতো আহ্লাদিত হতে পারেন কিন্তু এর পরিণতি বাংলাদেশের জন্য সুখকর হবে না। সম্মেলনে প্রধান অতিথি এবং সভাপতি— দুটোই ছিলেন শেখ হাসিনা স্বয়ং। এটাও কিছুটা দৃষ্টিকটু।

আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তিনিই মওলানা ভাসানীকে আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত করান। তার লেবাস, চেহারা-সুরত তখনকার দিনে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। কাগমারী সম্মেলনে আওয়ামী লীগের বিভক্তির (ন্যাপ ভাসানীর জন্ম হয়) পর মরহুম মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ সভাপতি পদে মওলানা ভাসানীর স্থলাভিষিক্ত হন। শ্মশ্রুমণ্ডিত মাওলানা তর্কবাগীশ দীপ্তিমান চেহারার অধিকারী ছিলেন। তিনি ৪৭-এর অবিভক্ত বাংলার নির্বাচিত এমএলএ। ৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ এলাকায় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মিছিলকারীদের ওপর যখন গুলিবর্ষণ করা হয়, তখন সংসদ অধিবেশন চলছিল (বর্তমান জগন্নাথ হলে তখন সংসদের অধিবেশন বসত)। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখান থেকে বেরিয়ে এসে তিনি হত্যার প্রতিবাদে পথসভায় আগুনঝরা বক্তৃতা করেন। আওয়ামী লীগের বর্তমান কাউন্সিলরদের কাছে এটা আষাঢ়ে গল্প বলেই মনে হবে। আমি ভেবে আশ্চর্যান্বিত ও বিস্ময়াভিভূত হই না যে, এভাবে চলতে থাকলে এখনকার প্রজন্ম ভাবতে শিখবে— শেখ হাসিনাই আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা। ভাগ্যের ওপর হিংসা করা নিঃসন্দেহে মহাপাপ। শুধু মোট ৮ বারে ৩৫ বছর দলের সভানেত্রী থাকাই নয়, সাধারণ গৃহিণী হতে অকস্মাৎ সভাপতি নির্বাচিত হওয়াও বিরল সৌভাগ্যের ব্যাপার। এ ধরনের ঘটনাপ্রবাহ রাজতন্ত্রেও বিরল। বেগম খালেদা জিয়ার জন্যও কথাটি প্রযোজ্য। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষণে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার ক্ষমতাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে মৌলিক একটা পার্থক্য এই যে, খালেদা জিয়া ক্ষমতাসীন দলের সভানেত্রী হয়েছিলেন। আর শেখ হাসিনা বিরোধী দলের সভানেত্রী হয়েছেন। তবে মরহুম হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ও আমাদের মুজিব ভাইয়ের সযত্ন লালিত্যে গড়ে ওঠা আওয়ামী লীগের শিকড়টি বাংলার মাটিতে ও মানুষের হৃদয়ের এত গভীরে প্রোথিত ছিল যে, দায়িত্ব নেওয়ার পর দীর্ঘ ১৫ বছর বিরোধী দলের রাজনীতি করলেও শেখ হাসিনার (বিরোধী দলের) চলার পথ অপ্রতিরোধ্য ছিল। কারণ সারাটি পথই মানুষের ভালোবাসার আবীর মাখানো ছিল। মানুষের নিষ্কলুষ ভালোবাসা ও জাতির জনকের প্রতি বাংলার মানুষের শর্তহীন আনুগত্য, তাদের আবেগ-উচ্ছ্বাস, মননশীলতা ও অনুভূতি, সব হারানোর বেদনায় হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হলেও কোটি মানুষের এই নিঃশর্ত আনুগত্য শেখ হাসিনাকে উদ্বেলিত করেছে, উচ্ছ্বসিত করেছে, আন্দোলিত করেছে।

সম্মেলনকে ঘিরে কথাগুলো আলোচিত হওয়া প্রয়োজন। কেননা, মানুষ যেন কখনো আওয়ামী লীগের গৌরবদীপ্ত ইতিহাস বিস্মৃত না হয়। এই সম্মেলনে বিভ্রান্ত ও সুযোগসন্ধানী বাম ধারার রাজনীতি ও নেতৃত্ব থেকে বিমুক্ত হতে না পারলেও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের উত্তরাধিকার ও স্বাধীনতার রূপকার ছাত্রলীগের একগুচ্ছ ব্যক্তিত্ব নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হওয়ায় আমি কিছুটা স্বস্তি পেয়েছি এই ভেবে যে, নিজেদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি না করে একযোগে আদর্শনিষ্ঠ গণতন্ত্রের সূর্যস্নাত বাঙালি জাতীয় চেতনায় বিকশিত সত্তা নিয়ে দলের অভ্যন্তরে সততার সঙ্গে তারা সুযোগসন্ধানী ভ্রান্ত বামদের হাত থেকে সংগঠনটিকে নিজস্ব আদর্শে প্রতিস্থাপিত করতে পারে। সেখানে সততা ও আদর্শের কোনো বিকল্প নেই। সততা, গণতান্ত্রিক চেতনা এবং ব্যক্তিগত সাহস ও দুর্নীতি-বিমুক্ত নির্মোহ অকুতোভয় চরিত্র অত্যাবশ্যকীয়।

বঙ্গবন্ধুর আদর্শের উত্তরাধিকারের গৌরবদীপ্ত সত্তায় নতুন প্রজন্মের আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের কাছে আমার দাবি, মৌলিক অধিকারটিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রামে ভূমিকা রাখুন। কাজটি কঠিন হলেও কাউকে না কাউকে দায়িত্বটি নিতে হবে। কারণ মৌলিক অধিকার-বিবর্জিত উন্নয়ন টেকসই তো হয়ই না, ক্ষমতাকেও সুদৃঢ় করতে পারে না। প্রান্তিক জনতা আজকে যে আতঙ্কিত, অনিশ্চিত ও শঙ্কিত হৃদয় এবং দেশের সার্বিক স্বাধীনতার প্রশ্নে তাদের উৎকণ্ঠিত হৃদয়ের যে দ্বিধা ও সংশয়— তা দূর করতে না পারলে দেশের স্বাধীনতা নিরঙ্কুশ হয় না।

সদ্য সম্পন্ন আওয়ামী লীগের কাউন্সিল সম্পর্কে বিবেকাশ্রিত মানুষের উপলব্ধি— এসব বিষয়ে কোনো গবেষণালব্ধ আলোচনা কাউন্সিলে হয়নি। এ ব্যাপারে, বিশেষ করে দেশের বৈদেশিক নীতির ওপর কোনো বিশ্লেষণমূলক নিবন্ধ তো আসেইনি, বরং ন্যূনতম আলোচনা না হওয়াটা অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। অনেক নিবন্ধ ও টকশোতে আমি বার বার উল্লেখ করেছি, আমাদের বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট হওয়া উচিত, আমরা ভারতের অকৃত্রিম ও নিষ্কলুষ বন্ধু থাকতে চাই। তবে বিন্দুমাত্র আধিপত্য মানতে নারাজ। মনোহর পারিকরের বিতর্কিত উক্তিটি সমগ্র বাঙালির কাছে অনভিপ্রেত, অনাকাঙ্ক্ষিত এবং ঔদ্ধত্যপূর্ণ। সদ্য সমাপ্ত কাউন্সিলে শুধু নেতা নির্বাচনই নয়, অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকে সুসংহত করা এবং বৈদেশিক নীতির ওপর আমাদের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা অত্যাবশ্যকীয় ছিল। এসবের নিরিখেই বলতে হয়, সম্মেলনটি জৌলুসপূর্ণ হলেও বুদ্ধিদীপ্ত ও চৌকস হয়নি। কী জাতি, কী দল— কেউ কোনো দিকনির্দেশনা পায়নি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে মন ও মননশীলতা তৈরি করে কেউ-ই সম্মেলন থেকে স্ব স্ব এলাকায় ফিরতে পারেননি।

     লেখক : স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা



আজকের জনপ্রিয় খবরঃ

গুরুত্বপূর্ণ অ্যাপ:

  1. বুখারী শরীফ Android App: Download করে প্রতিদিন ২টি হাদিস পড়ুন।
  2. পুলিশ ও RAB এর ফোন নম্বর অ্যাপটি ডাউনলোড করে আপনার ফোনে সংগ্রহ করে রাখুন।
  3. প্রতিদিন আজকের দিনের ইতিহাস পড়ুন Android App থেকে। Download করুন

Add Comment

Click here to post a comment