মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

অ্যানালগ আচরণে ডিজিটাল পথচলা!-এ কে এম শাহনাওয়াজ

%e0%a6%8f-%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%8f%e0%a6%ae-%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%93%e0%a7%9f%e0%a6%be%e0%a6%9cআমরা যারা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি ও তাদের প্রশ্রয়দাতাদের হাত থেকে দেশ বাঁচাতে চাই, সম্ভাবনাময় উন্নয়নের পথে হাঁটতে চাই—তাদের ভেতর একটি হতাশা আছে। আমরা জানি, চলমান রাজনীতিতে খুব বেশি জায়গা নেই, যেখানে আমাদের সমর্থন রাখতে পারি। অনেক সীমাবদ্ধতা ও অস্বস্তি থাকার পরও আওয়ামী লীগের ওপর ভরসা রাখতে চাই। আর বারবার প্রত্যাশা করি মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া দলটি যাতে জঞ্জালমুক্ত হয়ে সঠিক রাস্তা চিনতে পারে। জাতির দুর্ভাগ্য বঙ্গবন্ধুকে হারাতে হয়েছে। শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে দলটির ভেতর। তবে ভরসার প্রতীক হয়ে আওয়ামী লীগপ্রধান ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দৃঢ়তার সঙ্গেই এগিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু দলের ভেতর কোনো শুদ্ধি অভিযান না হওয়ায় এবং অতি আওয়ামী লীগার ও অতি বঙ্গবন্ধুপ্রেমিকদের লোভী পদচারণের কারণে দলটির ভেতর ডিজিটাল আচরণ তেমন লক্ষ করা যাচ্ছে না। দল রক্ষা ও শক্তি বৃদ্ধিতে এখনো সাতপুরনো পেশিশক্তিনির্ভরতা কমেনি। সুস্থধারা তৈরির কোনো প্রকল্প নেই।

আওয়ামী লীগের সম্মেলনের ভেতর থেকে যে নতুন আওয়ামী লীগ সম্ভাবনার দরজা খুলবে বলে প্রত্যাশা ছিল, এখন পর্যন্ত তেমন আশার আলো দেখছি না। সম্মেলনের ভাষণে আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ হাসিনা অনেক জরুরি কথা বলেছেন বটে; কিন্তু দলীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কোনো পরিকল্পনার কথা বলেননি। নতুন সাধারণ সম্পাদক কিছুটা ইঙ্গিত রাখলেও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশিত কথাটি আড়ালেই রয়ে গেছে। এখন তো আমাদের নেতানেত্রীদের কাছে একটি প্রিয় শব্দ হয়ে গেছে ‘জিরো টলারেন্স’। সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত দল বিন্যাসের পথে সম্মেলন বক্তৃতায় অমন শব্দের ব্যবহার ছিল না। তাই হয়তো ক্ষমতালিপ্সু সুবিধাবাদী নেতারা কোনো শাসন না পেয়ে উন্মত্ত হয়ে পড়েছেন। এর প্রতিফলন আমরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে দেখতে পেলাম। ক্ষমতার দ্বন্দ্বের বলি হতে হলো হিন্দু সম্প্রদায়ের গরিব মানুষদের। রামুর অঘটন থেকে শুরু করে নাসিরনগর পর্যন্ত যেসব তথ্য সংবাদমাধ্যমে এসেছে, তাতে বিবেকবান মানুষ হতাশ হয়েছেন। আওয়ামী লীগের গৌরবময় জায়গাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিএনপির বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু দলনের যে অভিযোগ আছে একে নিয়ে রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত করার সুযোগ আওয়ামী লীগ অনেকটা হারিয়েছে। আর ধারালো অস্ত্র তুলে দিয়েছে বিরোধী দলের হাতে। সৌভাগ্য এই যে বিরোধী দল এখন অস্ত্র ব্যবহারের মতো সক্ষম অবস্থায় নেই।

আওয়ামী লীগ ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়ে আশাবাদী করে তুলেছে বিশেষ করে তরুণ সম্প্রদায়কে। শুধু আইটি সেক্টরে কতটা ডিজিটাল অবয়ব পাওয়া গেল তা দিয়ে কি ডিজিটাল বাংলাদেশ হবে! চিন্তায়, আচরণে, দল পুনর্গঠনে যদি আধুনিক না হওয়া যায়, জনগণের ওপর আস্থা না রেখে যদি স্থানীয় ষণ্ডা-পাণ্ডাদের ওপর নির্ভর করে চলতে হয়, তাহলে আমাদের আশার জায়গা আর থাকে না। ছাত্রলীগ-যুবলীগের অনাচার ও সন্ত্রাসকে যদি পালকের নিচে ঢেকে রাখার অ্যানালগ রীতি এখনো চালু থাকে, তাহলে আওয়ামী লীগের আধুনিক অভিজাত দল হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হতে থাকবে।

গত ৮ নভেম্বরের পত্রিকায় দুটি রিপোর্ট দেখলাম। একটি কোনো এক পথসভায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কিছুটা ডিজিটাল সুরে সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী দলীয় নেতাদের ‘শুদ্ধ’ হয়ে যেতে বললেন। মনে করিয়ে দিলেন, না হলে সরকারের উন্নয়ন ও অর্জন বৃথা হয়ে যাবে। অন্যদিকে কোনো এক সভায় আওয়ামী লীগ নেতা হাছান মাহমুদ চরম অ্যানালগ সুরে রাজনৈতিক বক্তব্য দিলেন। নাসিরনগর ঘটনায় বিএনপিকে দায়ী করলেন আর আড়াল করতে চাইলেন দলীয় দুর্বৃত্তদের। এমন ভারসাম্যের রাজনীতিতে কি কোনো শুভ ফল পাওয়া যাবে?

দলের সাধারণ কর্মী থেকে শুরু করে সংস্কৃতিকর্মী, বুদ্ধিজীবী সবার মধ্যে তোষামোদির অ্যানালগ চিন্তা দলটিকে চিন্তায়-মননে আধুনিক হতে দিচ্ছে না। অনেক বছর পর গত সপ্তাহে সোনারগাঁয় লোকশিল্প জাদুঘরে গিয়েছিলাম। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ছিলেন এর স্বপ্নদ্রষ্টা। ভবনের বাইরে মূল চত্বরের কেন্দ্রে শিল্পাচার্যের একটি আবক্ষ ভাস্কর্য আছে, যা খুবই প্রাসঙ্গিক। কিন্তু এর কিছুটা পশ্চিমে ৭ মার্চের ভাষণের আদলে বঙ্গবন্ধুর বিশাল ভাস্কর্যটি কোনো রকম প্রাসঙ্গিকতা ছাড়া কেন স্থাপন করা হলো আমি মেলাতে পারলাম না। বঙ্গবন্ধু কি এতই ক্ষুদ্র যে প্রসঙ্গ ছাড়া যত্রতত্র ভাস্কর্য স্থাপন করে তাঁর উপস্থিতি মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিতে হবে! তা ছাড়া স্থাপত্যকলার নান্দনিকতার বিচারে লোকশিল্প জাদুঘর ভবন ও এর প্রবেশ অংশটিতে অবস্থানগত কারণে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যটি পুরো স্থাপনায় ভারসাম্যহীন আবহের সৃষ্টি করেছে। আমি জানি না, বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালোবাসার টানেই ভাস্কর্যটি নির্মিত হয়েছিল কি না।

সংস্কৃৎতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় লালবাগ দুর্গে বহু অর্থ ব্যয়ে ‘লাইট অ্যান্ড সাউন্ড’ শো চালু করেছে। পৃথিবীর অনেক দেশেই গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থাপনায় এ ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। ইতিহাসের নানা পর্যায়ে এই স্থাপনা ঘিরে যেসব ঘটনা ঘটেছে তাকে প্রজন্মের সামনে উপস্থাপনই এই শো প্রদর্শনের উদ্দেশ্য থাকে। লালবাগ দুর্গের এই প্রদর্শনীর স্ক্রিপ্টে কিছু কিছু ইতিহাসের ভুল তথ্য রয়েছে সে কথা না হয় বাদই দিলাম; কিন্তু শোর শেষে কেন যে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের অংশ শোনানো হচ্ছে, তা ভেবে পেলাম না। আমাদের জানামতে, বঙ্গবন্ধুর এই কালজয়ী ভাষণের সঙ্গে লালবাগ দুর্গের কোনো সম্পর্ক নেই। অতিবঙ্গবন্ধুপ্রেমিকরা কাজটি করে বঙ্গবন্ধুকে সম্মান দেখালেন, না ভাষণের মাহাত্ম্য খাটো করলেন, তা আমার বোধগম্য হলো না।

আগে দেখতাম আমলারা নিজেদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বিশ্বাস থাকলেও পাবলিক মিটিংয়ে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতেন। নিজের পদ-পদবি বিবেচনায় শব্দ চয়নে গাম্ভীর্য বজায় থাকত। এখন প্রতিযোগিতা দিয়ে যেন তাঁদের কেউ কেউ সরকারদলীয় একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে নিজেদের প্রচার করতে চান। এসব উদাহরণ এখন পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে আমলাতন্ত্রের সর্বত্র লক্ষ করা যায়। গত সপ্তাহে ঢাকার প্রতিবেশী এক জেলা সদরে বেশ জাঁকালো অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে গিয়েছিলাম। সেখানে দুজন এমপি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রী, স্কুল-কলেজের শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ অভ্যাগত উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের সভাপতি জেলার প্রধান কর্মকর্তার ভাষণ শুনে আমার পরিচিত ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এক স্নেহভাজন বলল, ‘স্যার, আমরা ছাত্রলীগের সক্রিয় রাজনীতি করেও তো এভাবে তেলের বাটি উপুড় করে দেব না।’ ও বলছিল, একজন সরকারি আমলা হয়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ যেভাবে স্তুতি করলেন, তাতে স্বয়ং বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে অস্বস্তি বোধ করতেন। এর চেয়েও এককাঠি বেশি এমপি মহোদয়দের স্তুতি গাইলেন। এর আগে একজন সম্মানিত এমপি একটি অসাধারণ বক্তব্য রেখেছিলেন। আমারও মনে হয়েছিল, অমন মার্জিত বক্তব্য দিতে পারেন যে এমপি এ ধরনের অসংস্কৃত স্তুতি তাঁকে নিশ্চয় বিব্রত করে থাকবে।

এ জন্যই আমরা বলব, অতি-আওয়ামী লীগার, অতিবঙ্গবন্ধুপ্রেমিকরা আওয়ামী লীগের প্রকৃত বন্ধু হতে পারে না। এসব সুবিধাবাদীই দলকে বারবার বিব্রত করে আর সংকটে ফেলে। অবশ্য আওয়ামী লীগের নেতানেত্রীরা এসব স্তুতি শুনতে কতটা পছন্দ করেন আমি জানি না। তবে প্রক্রিয়াটির পুরোটাই অ্যানালগ আচরণ। আওয়ামী লীগের নতুন নেতৃত্বকে ডিজিটাল পথে হাঁটতে হলে এসব মরচে পরা ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

আমরা আওয়ামী লীগের নতুন কমিটিকে স্বাগত জানাই। আমরা চাই, এবারের আওয়ামী লীগ আবার তার উজ্জ্বল অতীত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনুক। কিন্তু কাজটি সহজ নয়। স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত দলের নেতাকর্মী অনেককে পরিশুদ্ধ না করতে পারলে, আগাছা উপড়ে ফেলতে না পারলে দলটি ডিজিটাল অবয়ব পাবে না। আমার এক মেধাবী ছাত্র সেদিন বলছিল, ‘স্যার, আমার আত্মবিশ্বাস রয়েছে বিসিএসের বৈতরণী পাড়ি দিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছতে পারব। কিন্তু মৌখিক পরীক্ষায় যদি সব মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর নাম বলতে হয়, তাহলে ডাহা ফেল করব। এমন অনেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন ক্যাবিনেটে, যাঁদের আলোতে ভালো করে দেখিনি কখনো। আর তাঁদের কথা বলা—শব্দচয়ন শুনে মনে হয় আওয়ামী লীগ এত দুর্দশায় পড়ল কখন! কর্মভূমিকায় দেখা যায় তাঁরা স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী, কলহপ্রিয় ও অন্তর্দলীয় সংঘাত সৃষ্টিকারী। সরকার ও দলের জন্য তাঁরা স্বস্তির, না সংকটের, তা অবশ্য আওয়ামী লীগের নেতানেত্রীরা বিবেচনা করবেন। অতিসম্প্রতি নাসিরনগরের সূত্রে টিভি রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে তেমনই মনে হয়েছে।’

আমাদের ভাবনা, অমন বলয় থেকে আওয়ামী লীগের মতো একটি দল বেরিয়ে আসতে পারে না কেন! রাজনীতির মেরুদণ্ড কি এখনো শক্ত হয়নি আওয়ামী লীগের? এত বড় দলে শিক্ষিত, মার্জিত ও দল আর দেশকে ভালোবাসেন এমন নেতা কি খুঁজে পাওয়া যায় না?

রাজনৈতিক কোন্দল ও একে-অপরকে বিপাকে ফেলতে চাওয়ার সাতপুরনো স্টাইলে নিরীহ মানুষদের গিনিপিগ করে তাদের ওপর চড়াও হওয়ার মতো ভয়ানক ও নিম্নমানের রাজনীতি আওয়ামী লীগের তকমা পরা রাজনৈতিক টাউটরা করতে পারে, তা ভাবা যায় না। এর জন্য যে দল দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেবে তেমন মনে হয় না। রামুর ঘটনার পর থেকে এ পর্যন্ত এমন দৃষ্টান্ত স্থাপনের খবর আমাদের কাছে নেই।

কিন্তু আমাদের রাজনীতির বিধায়করা সত্যটি বিবেচনায় রাখতে চান না কেন যে দল ও দলীয় রাজনীতিকরা অ্যানালগ যুগে পড়ে থাকলেও সাধারণ মানুষ ডিজিটালের ছোঁয়া পেয়েছে। সংবাদমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সূত্রে অনেক থলের বিড়াল বেরিয়ে আসছে। তাই নয়ছয় দিয়ে মানুষকে বোঝানো অনেক কঠিন হবে। সাধারণ মানুষের আস্থা থেকে সরে এলে উপরি কাঠামো যতই ঝলমলে হোক, ভেতরে ঘুণপোকার কুরে খাওয়া থামবে না। কখন হোঁচট খেয়ে পড়তে হবে কে জানে! আমরা আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে অমনটি দেখতে চাই না। আমরা চাই আওয়ামী লীগ সরকার যেমন ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছে, মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে এসেছে কম্পিউটার আর ইন্টারনেট, তেমনি সাহস করে দলের ভেতরের সব অ্যানালগ আচরণ ও নীতির মূলোচ্ছেদ করে ডিজিটাল আধুনিকতা ছড়িয়ে দিক। শেখ হাসিনার সাহসিকতা ও দৃঢ়তা দেশপ্রেমিক মানুষদের অনেক বেশি আশাবাদী করেছে। প্রত্যাশা থাকবে এই জননেত্রী সব অন্যায় আর জরার মূলোচ্ছেদ করে আওয়ামী লীগকে একটি আধুনিক ও দেশপ্রেমিক দলে পরিণত করবেন। তোষামুদেদের প্রশ্রয় না দিলে এ পথে চলা খুব কঠিন হবে—আমাদের তেমন মনে হয় না।

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com

Add Comment

Click here to post a comment