মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

অপরাজিতা জয়ললিতা-অমিত বসু

001753আবার তামিল ছবির নায়িকা কাজল? একবার অনুরোধেই হ্যাঁ। নায়ক তামিল চিত্রজগতের জীবন্ত কিংবদন্তি রজনীকান্তের জামাতা ধনুষ।

পরিচালক তাঁর কন্যা সৌন্দরাইয়া। ছবির নাম ‘ভেলাইলা পাট্টাথারি ট্যু’। প্রয়াসটা ২০১৪ সালে হয়েছে। এবার তারই দ্বিতীয় অধ্যায়। তামিল তেলেগু দুই ভাষাতে শ্যুট করা হবে। কাজল কী করবেন। তিনি দুটির একটি ভাষাও জানেন না। বাঙালি হয়েও বাংলায় দুর্বল। বয়স ৪২। দুই সন্তানের মা। শাহরুখ খানের সঙ্গে একের পর এক ছবি করে আকাশ ছুঁয়েছেন। আপাতত বলিউডের কোনো পরিচালক তাঁকে নিয়ে ছবি করার কথা ভাবছেন না। তাতে কাজলের কিছু এসে যায় না। তামিল ছবির অফার পেয়েই তিনি কৃতার্থ। তাঁর প্রথম তামিল নায়িকা হওয়া ১৯৯৭ সালে ‘শিনাশারা কাশাভু’-তে। পাশে ছিলেন অরবিন্দ সামি ও প্রভু দেবা। হিন্দিতে ডাব করার পর নাম হয় ‘স্বপ্নে’। তখন বয়স কম। উপচে পড়া চমক। ছবিটা হিট করেছিল। এখন বয়সের ভারে অনেকটাই ভারাক্রান্ত। নায়ক ধনুষের বয়স অনেক কম। পাল্লা দিয়ে অভিনয় করা সহজ নয়। জানুয়ারিতে শুটিং শুরু। হাতে সময়ও নেই। বিরাট চ্যালেঞ্জ কাজলের। স্বামী অজয় দেবগন হতভম্ব। কিভাবে স্ত্রীকে সাহায্য করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। তামিল ছবির নায়িকা হওয়া যে গর্বের তিনি জানেন। আজও হিন্দি বা বাংলায় তামিল, তেলেগু গল্প চুরি করে ছবি করা হয়। তামিল ছবির বাজার বিশ্বজোড়া। হিন্দি ছবির চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। তারা বলিউডের পরোয়া করে না। চলে নিজেদের চালে। শাহরুখ খান তামিলনাড়ুর পটভূমিকায় ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’ করেছিলেন রজনীকান্তকে কুর্নিশ করে। জানতেন, একচুল ভুল হলে রক্ষা নেই।

তামিলনাড়ুকে শ্রদ্ধা করে সিনেমা জগতের নায়ক-নায়িকারা। অন্য কেউ হাল ধরলে মানতে চায় না কেউ। ৫ ডিসেম্বর মাত্র ৬৮ বছর বয়সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী জে জয়ললিতা প্রয়াত হতেই অপরিসীম শূন্যতা। জয়ললিতা ছিলেন তামিল ছবির জনপ্রিয়তম নায়িকা। তাঁকে ঘিরে উজ্জ্বল আলোর বলয়। রাজনীতিতে প্রবেশ করতেই স্বতঃস্ফূর্ত স্বীকৃতি। তার আগের মুখ্যমন্ত্রী এম জি রামচন্দ্রন নায়ক হয়ে ঝড় তুলে রাজনীতিতে ঢুকেছিলেন। তাঁকে পেয়ে আবেগে ভেসেছিল মানুষ। তামিল ভাষার মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে লড়েছেন আজীবন। তামিল জাতিকে একসূত্রে বেঁধে রাখাটা ছিল তাঁর মিশন। বিশ্বে যেখানেই তামিল, সেখানেই তিনি। শ্রীলঙ্কার তামিলদের গায়েও কোনো আঁচ পড়তে দিতেন না। মুসলমান তামিল, খ্রিস্টান তামিল, হিন্দু তামিলের পার্থক্য ছিল না তাঁর চোখে। একই ঐতিহ্য ধরে রেখেছিলেন জয়ললিতা। রামচন্দ্রনের হাতে গড়া শিষ্যা। তামিলনাড়ুর আঞ্চলিক দল এআইএডিএমকে প্রতিষ্ঠার পর রামচন্দ্রন নজর দিয়েছিলেন শিল্পায়নে। জয়ললিতা তাঁকেই অনুসরণ করেছেন। আজ ভারতে তামিলনাড়ু উৎপাদনশীলতায় এক নম্বরে।

বিরোধী নেতা ডিএমকের করুণানিধিও ছিলেন সিনেমার হিরো। রাজনীতিতে বরেণ্য হয়েছেন সে কারণেই। করুণানিধি ৯০ পেরিয়েছেন। কার হাতে দায়িত্বভার তুলে দেবেন ভেবে পাচ্ছেন না। ছেলে স্টালিন তাঁর রাজনৈতিক সহযোগী হলেও তিনি সিনেমা জগতের কেউ নন। দলই তাঁকে নেতা হিসেবে মানতে চাইছে না। অ্যাকটিভ রাজনীতিক হয়েও তিনি অসহায়। ফাঁপরে পড়েছেন করুণানিধি। বাবা হয়েও ছেলের জন্য কিছু করতে পারছেন না। পাঁচ মাস আগে বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর দল ডুবেছে। স্টালিন সিনেমার নায়ক হলে সেটা হতো না।

একই সমস্যা জয়ললিতার দলে। তিনি চলে যাওয়ার পর হাল ধরবেন কে। তাঁর জায়গায় মুখ্যমন্ত্রী পনির সেলভম। অর্থমন্ত্রী থেকে মুখ্যমন্ত্রী। রাজনীতি বোঝেন। অভিজ্ঞতা অনেক। দল তাঁকে নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত। সবাই মানতে চাইছে না। দাবি একটাই, সিনেমার লোক চাই। যাকে মানুষ একবাক্যে গ্রহণ করবে। তামিল অভিনেতা অজিতের নাম উঠেছিল। তাঁর জনপ্রিয়তা থাকলেও গ্ল্যামার কম। অভিনেতা হলেই হবে না। তাঁকে শীর্ষস্থানীয় হতে হবে। যার সঙ্গে মানুষের মরাবাঁচা জড়িয়ে থাকবে। প্রবীণ নেতা ই রামমূর্তি তক্কে তক্কে ছিলেন। এই ফাঁকে যদি চান্স পাওয়া যায়। তাঁর দিকে কেউ ফিরেও চায়নি। দিল্লির লোকসভার ডেপুটি স্পিকার থাম্বুদুরাই চেন্নাইয়ে ফিরতে চেয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী হয়ে। দল তাঁকে জানিয়ে দিয়েছে, আপনি যেখানে আছেন সেখানে থাকুন। নড়াচড়ার চেষ্টা করবেন না। জয়ললিতার ঘনিষ্ঠ শশীকলা উচ্চাকাঙ্ক্ষী। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার লোভ কম ছিল না। দলে দাপটও যথেষ্ট। দলের ১৩৬ জন বিধায়কের ৬০ জন তাঁর দিকে। রুপালি পর্দার ব্যাকগ্রাউন্ডও আছে। হলে কী হবে, তাঁকে ঘিরে মানুষের উন্মাদনা কোথায়। তা না থাক, একটা প্লাস পয়েন্ট অবশ্যই আছে। তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রকে দত্তক নিয়েছিলেন জয়ললিতা। নিজে উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ হয়েও অন্ত্যজশ্রেণির থেবর সম্প্রদায়ের শিশুকে কোলে টেনে নেওয়া কম কথা নয়। তিনি যে জাতপাত মানেন না, এ তারই প্রমাণ।

জয়ার আরো বড় লড়াই পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে। রামচন্দ্রন চলে যেতে দলের নেতারা তাঁকে নেতৃত্ব দিতে অস্বীকার করেন। ভাবখানা ছিল এই, মহিলা হয়ে তিনি কিভাবে রাজ্য বা দল আগলাবেন। কুর্শিতে বসে তার জবাব দিয়েছেন জয়ললিতা। ১৯৮১ থেকে একবার নয়, ছয়বার মুখ্যমন্ত্রী।

১৯৭১ সালে ‘অধিপরাশক্তি’ ছবিতে আম্মা হয়েছিলেন জয়ললিতা। সেই ইমেজটাই রাজনীতিতে স্থায়ী হয়ে যায়। তাঁর মনেও বাবার চেয়ে মায়ের স্থান ছিল উঁচুতে। বাবার দিক থেকে কর্নাটকের মান্ডিয়াম আয়েঙ্গার গোষ্ঠীর মেয়ে হয়েও চিরদিন শ্রীরঙ্গম জাই মায়ের বংশপরিচয়ে নিজেকে তামিল বলে এসেছেন। কন্নড়রা তাঁর বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হলেও তিনি পরোয়া করেননি।

১৯৯৯ সালে তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি তখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী নন। সুন্দর শাড়ি উপহার দিয়ে শুভেচ্ছা কামনা করেছিলেন। মুগ্ধ হয়েছিলেন তাঁর ব্যক্তিত্বে। জয়ললিতার তামিল সংহতি রক্ষা করার মতো বাঙালিকে এক করে দেখাটা শিখতে পারেননি। পারলে তিস্তাচুক্তি আটকে বাঙালি হয়ে বাংলাদেশের বাঙালিদের অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হতেন না।

লেখক : কলকাতার সাংবাদিক

Add Comment

Click here to post a comment